


প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া প্রায় ৩.৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা) দেশে ফিরিয়ে এনেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতারণায় নিঃস্ব হওয়া সহস্র ভুক্তভোগীর এই খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারকে বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করছে সিআইডি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজি মো. আবুল বাশার তালুকদার বলেন, ‘এটি বড় সাফল্য যে, অনেক চেষ্টা আর নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে প্রতারণার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পাচার হওয়া প্রায় সাড়ে ৪৪ কোটি টাকা আমরা ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছি। এ ব্যাপারে আরও তদন্ত চলছে। পরবর্তীতে বিস্তারিত জানানো হবে।’
এমটিএফই প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া প্রায় ৪৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দেশে ফিরিয়ে এনেছে সিআইডি। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেড’ এবং জেপিমরগান চেজ ব্যাংকের সহায়তায় এই বিশাল অংকের ক্রিপ্টো সম্পদ উদ্ধার করা হয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে একে সিআইডির একটি মাইলফলক বা বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে
তিনি বলেন, ‘২০ হাজার ডলারের বেশি অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথিপত্র প্রয়োজন হওয়ায় ২৪ মার্চ এ সংক্রান্ত কাগজপত্র চাওয়া হয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে রোববার (২৯ মার্চ) সিআইডির সোনালী ব্যাংকের হিসাবে অর্থ জমা হয়েছে।’
এমটিএফই প্রতারণার বিস্তার
২০২২ সালের মাঝামাঝি কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৩ সালের শুরুতে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ব্যবহারকারীদের ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থ ডিজিটাল ডলার হিসেবে দেখানো হতো।
মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম পদ্ধতিতে কাজ করত এমটিএফই। সিনেমা নির্মাণ ও ফরেক্স ট্রেডিংয়ের নামে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশিকে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করত প্রতিষ্ঠানটি। কৃত্রিম লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখিয়ে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করা হতো এবং ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ বিনিয়োগকারীদের কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে প্ল্যাটফর্মটি উধাও হয়ে যায়
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ বশির উদ্দিন জানান, পুরো কার্যক্রমই ছিল নিয়ন্ত্রিত প্রতারণা। কৃত্রিমভাবে লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করা হতো। শুরুতে কিছু অর্থ পরিশোধ করে আস্থা তৈরি করা হলেও ২০২৩ সালের মাঝামাঝি হঠাৎ উত্তোলন বন্ধ করে প্ল্যাটফর্মটি উধাও হয়ে যায়।
এমটিএফই প্রতারণায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
সিআইডি’র ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ও সাইবার পুলিশ সেন্টারের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। দেশের উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাসহ ঢাকা, বরিশাল, রাজশাহী, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সাতক্ষীরার হাজারও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ বশির উদ্দিন বলেন, ‘এক ভুক্তভোগীর দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। পরে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয় এবং মূল হোতাসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।’
উদ্ধারকৃত অর্থ বর্তমানে সিআইডির সোনালী ব্যাংকের হিসেবে জমা আছে। সিআইডি জানিয়েছে, বিষয়টি এখনও আদালতে বিচারাধীন। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার আলোকে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর একটি স্বচ্ছ বণ্টন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত ভুক্তভোগীদের মাঝে এই অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া হবে
তদন্তে মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য
তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত অর্থ সম্পূর্ণ কাল্পনিক ছিল। বিনিয়োগকারীদের টাকা বিভিন্ন ক্রিপ্টো ওয়ালেটে স্থানান্তর করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যার মধ্যে আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জও ছিল।’

‘পরবর্তীতে বিদেশি সংস্থার সহায়তায় এসব সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্রিপ্টো সম্পদ শনাক্ত ও জব্দ করা সম্ভব হয়।’
পাচার হওয়া অর্থ যেভাবে ফেরাল সিআইডি
সিআইডির কর্মকর্তারা জানান, অর্থ দেশে ফেরানোর জন্য গত বছরের নভেম্বরে ‘অ্যাসেট রিয়েলিটি লিমিটেড’-এর সঙ্গে চুক্তি করে সিআইডি। প্রতিষ্ঠানটি জব্দ করা ক্রিপ্টো সম্পদ নগদ ডলারে রূপান্তর করে বাংলাদেশে পাঠায়। এ প্রক্রিয়ায় তারা ২.৫ শতাংশ সেবা ফি গ্রহণ করে। সোনালী ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট হিসাবে এই অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।
যেভাবে অর্থ ফেরত পাবেন ভুক্তভোগীরা
এ বিষয়ে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ বশির উদ্দিন জানান, যেহেতু বিষয়টি এখনও বিচারাধীন, এর সমাধান হবে আদালতেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালতের নির্দেশনার আলোকেই ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীদের যাচাই-বাছাই শেষে অর্থ বণ্টন করা হবে।