


গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দেশজুড়ে ভেঙে পড়েছিল ক্ষমতার দাম্ভিক দেয়াল। পুড়ে গিয়েছিল বহু দলীয় কার্যালয়—অভিজাত ভবন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের অফিস। সেই ধারাবাহিকতায় দিনাজপুরের খানসামা উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টিও পরিণত হয়েছে এক নির্মম নিদর্শনে। এক সময়ের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রটি এখন শুধুই স্মৃতিচিহ্ন; সেখানে এখন বসেছে পান, চা, বিড়ি-সিগারেটের দোকান। বেহাল ভবনটি এখন সাধারণ মানুষের গণশৌচাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
শুক্রবার (২০ জুন) রাতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাকেরহাটে অবস্থিত উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টির দেয়ালে আগুনের পোড়া দাগ এখনো স্পষ্ট। ছাইভস্ম হয়ে যাওয়া কাঠ, ভাঙা কাচ আর স্যাঁতসেঁতে মেঝে জুড়ে পড়ে আছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পোড়া কাগজপত্র। ভবনের স্টিলের নামফলক ইতোমধ্যেই খুলে ফেলা হয়েছে। মুছে ফেলা হয়েছে ‘আওয়ামী লীগ’ নামের চিহ্ন। ভবনটির দক্ষিণে সামনের একাংশ দখল করে বসানো হয়েছে একটি অস্থায়ী দোকান—যেখানে বিক্রি হচ্ছে চা, পান, বিড়ি, সিগারেট। কার্যালয়ের নিচতলাকে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে পাবলিক টয়লেটের মতো। যেই ভবনেই চলত নানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বৈঠক, দলীয় সভা, তদবির, ক্ষমতার লেনদেন। এখন সেই ভবন দাঁড়িয়ে আছে যেন ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হয়ে।
স্থানীয় পথচারীদের অনেকে ভবনটি দেখিয়ে বলেন, “এই ভবনে বসেই মানুষ মারার সিদ্ধান্ত হতো। পুলিশ কাকে ধরে, কার ওপর মামলা হয়—সেসব এখান থেকেই ঠিক হতো।”
কেউ কেউ বলেন, “আওয়ামী লীগ যেভাবে দেশের মানুষকে শোষণ করেছে, এখন তারই ফল ভোগ করছে। এই ভবন থেকেই নির্যাতনের নকশা তৈরি হতো।”
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে দলীয় কার্যালয়গুলো হয়ে উঠেছিল সিদ্ধান্ত কেন্দ্র, কিন্তু সে সিদ্ধান্ত ছিল অনেকাংশেই জনস্বার্থবিরোধী। যেখানে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হতো, সেখানে জনগণের কণ্ঠ রুদ্ধ হতো। এখন সেই কার্যালয়, সেই কাঠামোই ভেঙে পড়েছে জনগণের হাতে। ভবনটি দেখতে গিয়ে মনে হয়, সময় যেন এক নির্মম প্রতিশোধ নিয়েছে। এতদিন যে ভবনটি ছিল দম্ভের চূড়া, এখন তা সবার চোখে উপহাসের প্রতীক।
জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন, ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের মুখে সারা দেশে আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলোতে হামলার ঢেউ ওঠে। অনেকটা একই সময়ে খানসামার এই কার্যালয়টিতেও চালানো হয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ। ভবনের আসবাবপত্র রাস্তায় বের করে এনে জনতা নিজ হাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ভবনের স্টিলের নামফলক উপড়ে ফেলা হয়। এর পর থেকেই কার্যালয়টি বন্ধ, জনশূন্য, অরক্ষিত। এরপর থেকে আর কোনো নেতাকর্মী সেখানে যাননি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পতনের পর থেকেই উপজেলার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও অনেকেই এখন আত্মগোপনে, অনেকে এলাকা ছেড়ে গেছেন বলেও জানা গেছে।
এমনকি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সফিউল আযম চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি এবং বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মতে, “দল যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তার অফিসগুলোও জনরোষের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আজকের চায়ের দোকানে পরিণত হওয়া ভবনগুলো সেই বাস্তবতারই প্রমাণ।”
এক সময়ের সাংগঠনিক ঘাঁটি এখন স্থানীয়দের চোখে শুধু একটি পোড়া ঘর, যার স্মৃতি ভয় ও নির্যাতনের সঙ্গে মিশে আছে। কোনো রকম আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই কার্যালয়টি কার্যত বিলুপ্ত, তবে এটাই হয়তো রাজনৈতিক বাস্তবতার নিষ্ঠুর প্রতিফলন।