
মাত্র নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বিয়ে হয়ে যায়। বয়স তখন মাত্র ১৪। যে বয়সে একজন কিশোরীর হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সেই বয়সেই সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে সাবিনা ইয়াসমিনের কাঁধে। স্বপ্ন দেখার আগেই বাস্তবতার কঠিন দেয়ালে ধাক্কা খায় তার জীবন।
ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলায় জন্ম নেওয়া সাবিনা ইয়াসমিনের শৈশব ছিল সাধারণ। পড়াশোনায় ভালো ছাত্রী ছিলেন তিনি। বন্ধু মহল আজও আফসোস করে বলেন—“আমরা একটা ভালো ছাত্রী হারিয়ে ফেলেছিলাম।” কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়া মেয়েটিই একদিন আবার উঠে দাঁড়াবেন, তা তখন কেউ কল্পনাও করেনি।
বিয়ের পর বোচাগঞ্জ উপজেলায় শ্বশুরবাড়িতে আসেন সাবিনা। সংসার, মান-অভিমান, সামাজিক চাপ—সবকিছুর মধ্যেই তার ভেতরে চাপা পড়ে থাকে একটি ইচ্ছে—আবার পড়াশোনা শুরু করবেন। প্রথমে স্বামীর পক্ষ থেকে বাধা আসে। কিন্তু ধৈর্য, যুক্তি আর অদম্য মনোবল দিয়ে তিনি বুঝিয়ে বলেন—“পড়াশোনা করলে আমি পরিবারকেই শক্ত করব।” একসময় স্বামীও পাশে দাঁড়ান।
সংসারের কাজ আর পড়াশোনা একসঙ্গে চালাতে গিয়ে আবার জীবনে আসে বড় ধাক্কা। ক্লাস টেনে পড়ার সময়ই তিনি মা হয়ে যান। অনেকেই তখন বলেছিলেন, “এবার আর সম্ভব না।” কিন্তু সাবিনা ইয়াসমিন হার মানেননি। সন্তানকে কোলে নিয়েই চালিয়ে যান পড়াশোনা। শেষ পর্যন্ত তিনি এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেন।
এর মধ্যেই স্বামী জীবিকার তাগিদে বিদেশে কাজ করার জন্য যান। কিন্তু সেখানে প্রতারণার শিকার হন। সবকিছু ভেঙে পড়ে। সংসারে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা। সেই সময়টাকে সাবিনা ইয়াসমিন আজও বলেন—আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়।
কিন্তু অন্ধকার সময়েই জন্ম নেয় নতুন আলো। পরিবার বাঁচাতে তিনি একটি প্রকল্পে যুক্ত হন। পাশাপাশি ডিগ্রি কমপ্লিট করেন। শুধু এখানেই থেমে থাকেননি—৫ বছর মেয়াদি হোমিওপ্যাথি কোর্স সম্পন্ন করে নিজেই হয়ে ওঠেন একজন চিকিৎসক। বোচাগঞ্জে খুলে ফেলেন হোমিওপ্যাথি চেম্বার।
চিকিৎসা দিতে দিতে একদিন এক নারী রোগী তাকে বলেন—আপা, বাজারে এত ভিড়, এত পুরুষ—মেয়েদের স্বস্তিতে কেনাকাটার পরিবেশ নেই। কথাটি সাবিনা ইয়াসমিনের মনে গভীর দাগ কাটে। সেদিনই তার মনে জন্ম নেয় এক নতুন স্বপ্ন—নারীদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক একটি বাজারের জায়গা তৈরি করবেন।
সেই স্বপ্ন থেকেই দুই বছর আগে যাত্রা শুরু করে ‘মা প্লাজা’। দোকানের নাম রাখেন নিজের সন্তানের নামে—সাকিব বস্ত্র বিতান। সাকিব তার ছেলে, একজন হাফেজ। সন্তানের নামের সঙ্গে মিশে আছে তার সংগ্রাম, তার বিশ্বাস আর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা।
সেতাবগঞ্জ স্কুলরোডের তিন রাস্তার মোড়ে অবস্থিত মা প্লাজা আজ শুধু একটি কাপড়ের দোকান নয়—এটি নারীর আত্মমর্যাদার প্রতীক। এখানে পুরুষ কর্মী নেই। সব কর্মী নারী। ফলে নারী ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা করতে পারেন।
বিশেষ করে মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য বোরকা, হিজাব ও পোশাক এবং এতিমখানার শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় লাভ ছাড়াই বা নামমাত্র মূল্যে দেওয়ার চেষ্টা করেন সাবিনা ইয়াসমিন।তিনি বলেন,আমি ব্যবসা করি ঠিকই, কিন্তু লাভই আমার একমাত্র লক্ষ্য না। এতিম শিশু আর মাদ্রাসার মেয়েরা যেন কষ্ট না পায়—এই ভাবনাটাই আমাকে শান্তি দেয়।
মা প্লাজায় আসা ক্রেতারা এখানকার পরিবেশে আলাদা স্বস্তি খুঁজে পান।ক্রেতা সামিরা আক্তার বলেন,বাজারে গেলে আমার অস্বস্তি লাগে। কিন্তু এখানে আসলে সাহস পাই। মনে হয়, এটা আমাদের জায়গা।সানজিদা আক্তার বলেন,এখানে এলে মনে হয় আপন মানুষের কাছে এসেছি। আপুগুলোর সঙ্গে সব কথা বলা যায়। বাচ্চাদের জন্যও সুন্দর কালেকশন আছে।
শুধু ক্রেতা নয়, এখানে কাজ করা নারীরাও নিজেদের বদলে ফেলেছেন।টেইলার মাসুমা আক্তার বলেন,এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে নিজের ওপর বিশ্বাস বেড়েছে। পরিবেশটা নিরাপদ, নিরিবিলি। একজন নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে কাজ করাটা আমাদের জন্য গর্বের।
আজ সাবিনা ইয়াসমিন শুধু একজন ব্যবসায়ী নন—তিনি একজন অনুপ্রেরণা। যে মেয়েটি ১৪ বছর বয়সে বিয়ের কারণে পড়াশোনা হারিয়েছিল, সেই মেয়েটিই আজ বহু নারীর সাহসের গল্প হয়ে উঠেছেন।তিনি বলেন,আমি চাই, কোনো মেয়েই যেন স্বপ্ন দেখা ছেড়ে না দেয়। জীবন যত কঠিনই হোক, চেষ্টা করলে আল্লাহ পথ খুলে দেন। বোচাগঞ্জের এই নারী উদ্যোক্তার গল্প প্রমাণ করে—সংগ্রাম যদি হয় সাহসী, স্বপ্ন যদি হয় মানবিক, তবে হারিয়ে যাওয়া জীবনও নতুন করে আলো ছড়াতে পারে।
Related