


দিনাজপুরের পার্বতীপুরে শিলাবৃষ্টিতে ৫০০ ঘরবাড়ী ও ১ হাজার বর্গাচাষীর ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শিলার আঘাতে ঘরের টিনের চাল ফুটো হয়ে গেছে এবং প্রায় ২ হাজার কৃষকের চলতি বোরো ধান, ভুট্টা, আম-লিচু, সবজ্বীসহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিলাবৃষ্টির ফলে ফসল ও ফলের মুখ দেখার আগেই ১ হাজার বর্গাচাষীর মাথায় হাত পড়েছে। উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ২০টি গ্রামে এ শিলাবৃষ্টি হয়ে ঘরবাড়ী ও ফসলের ক্ষতি হয়। শিলার আঘাতে মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো হচ্ছে, কুড়িয়াইল, বালুপাড়া, হাজিপাড়া, হরিহরপুর, চকযামিনী, কাজিপাড়া, শেড়মপাড়া, কাশিপুর, ছোট চন্ডিপুর, পশ্চিম দুর্গাপুর, বেজাই, বাজেটপুর, দেবকুন্ডা, আয়মাপাড়া, রাধানগর, বড়দল, কালিরহাট, জোতাইল, খিয়ারপাড়া ও হবিবপুর লালমাঠি। এছাড়া শিলা বৃষ্টিতে সদ্য গুটি আসা আম ও লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, শিলাবৃষ্টিতে কি পরিমাণ ফসলের ক্ষতির হয়েছে তা নিরূপণ করা হচ্ছে।
উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: মতিয়ার রহমান প্রামাণিক জানান, শিলাবৃষ্টির আঘাতে চকযামিনী গ্রামসহ ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের ৫০০ ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় দুই হাজার কৃষকের বোরো ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ৬০ বছর আগেও এত শিলাবৃষ্টি কখনো দেখেননি। গেল মঙ্গলবার বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ৪ দফায় প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে শিলা পড়তে থাকে। গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে স্থানীয় সাথে কথা বলে জানা যায়, দেড় ঘন্টা ধরে চলা বৃষ্টিতে কোথাও কোথাও শিলার স্তূপ জমে বরফের মতো সাদা হয়ে যায়। শিলাবৃষ্টির আঘাতে মাটির সঙ্গে নুইয়ে পড়েছে উঠতি বোরো ফসলের ধান, গম, ভুট্টা, মরিচসহ বিভিন্ন ফসল ও সবজি। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দেখা যায়, ধানগাছগুলো হেলে পড়ে আছে মাটিতে। কোনো ধানগাছে শিষ দেখা যাচ্ছে। কোনো জমির ধানগাছে শিষ আসার উপক্রম। আবার কোনো জমির ধানগাছ ছোট। আম আর লিচুগাছের নিচে অসংখ্য মুকুল দেখা গেছে। মোস্তফাপুর ইউনিয়নের কুড়িইল গ্রামের নিরানন্দ রায় বলেন, হঠাৎ করেই বড় বড় শিলা পড়তে শুরু করে। শিলার আঘাতে ঘরের টিনের চাল পুরোপুরি ফুটো হয়ে গেছে।
মোস্তফাপুর ইউনিয়নের বড়দল এলাকার কৃষক দুধ কুমার বলেন, তিনি ৩০ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। শিলাবৃষ্টিতে জমির ধান গাছ মাটিতে নুয়ে পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। একই এলাকার কৃষক ইয়াছিন আলী বলেন, এমন শিলাবৃষ্টি আগে কখনো দেখিনি আমি। এতে আমার ৪ বিঘা জমির ধান খেতের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আমিনুল ইসলাম নামে এক মরিচ চাষি জানান, ব্যাপক শিলাবৃষ্টির ফলে তার জমির মরিচের খেত সবটুকু নষ্ট হয়ে গেছে। বড়দল গ্রামের কৃষক দেবেন্দ্রনাথ জানান, শিলাবৃষ্টিতে প্রায় ১৮ বিঘা জমিতে লাগানো বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। অধিকাংশই ধানগাছ মাটিতে হেলে পড়েছে।
গত বুধবার শিলাবৃষ্টির পর ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের খেত দেখতে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি বিশেষ টিম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। মোস্তাফাপুর ইউনিয়নের ৭নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইয়াকিন আলী বলেন, শিলাবৃষ্টিতে ইউনিয়নের ৪,৬,৭,৮ ও ৯ ওয়ার্ডগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব ওয়ার্ডের ৫০০ ঘরবাড়ী ও দুই হাজার কৃষকের ফসল ক্ষতির সম্মুখিন। এরমধ্যে প্রায় ১ হাজার বর্গাচাষী কৃষক তারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
পার্বতীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার মো: ছানাউল্লাহ জানিয়েছেন, বৃস্পতিবার এখন পর্যন্ত শিলাবৃষ্টিতে প্রায় সাড়ে ৩০০ ঘরবাড়ী টিন চাল ফুটো হওয়া তালিকা পেয়েছি। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ীর ওই তালিকা ইতিমধ্যে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত আসছে ওই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার তাদেরকে বলা হচ্ছে মোস্তফাপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যকে জানানোর জন্য।
পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব হুসাইন জানান, উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ৮৫ হেক্টর বোরো ধান গাছ নুয়ে পড়েছে। ভুট্টা ২ হেক্টর, মরিজ ০.৫ হেক্টর, সবজি ০.২ হেক্টর ক্ষতি হয়েছে। শিলাবৃষ্টিতে কি পরিমাণ ফসলের ক্ষয়ক্ষতি তা নিরূপণ করা হচ্ছে। পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. সাদ্দাম হোসেন বলেন, শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতির মুখে পড়েছে ঘরবাড়ী ও ফসল। প্রায় ৫০০ ঘরবাড়ীর ক্ষতির তালিকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ওই শিলাবৃষ্টিতে ফসলের কি পরিমার ক্ষতি হয়েছে তা নিরুপনের কাজ করছে কৃষি বিভাগ।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, পার্বতীপুর উপজেলায় ফসলের ক্ষতির তথ্য পেয়েছেন। রোগ পোকা আক্রান্ত হয়েছে তারা কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিবে। ক্ষতির শিকার তারা আউশ চাষ করবে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা পুষে নিতে পারবে। শিলাবৃষ্টিতে কি পরিমাণ ফসল আক্রান্ত হয়েছে তা এখনও নিরূপণণের কাজ চলছে।