
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সিনিয়র নেতাদের নিয়ে উগ্র মন্তব্য করেছেন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ও জগনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান লিটন। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল ১০ মার্চ (সোমবার) বিকেলে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা পরিষদের তৃতীয় তলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল (এলজিইডি) কার্যালয়ের সামনে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, সদর উপজেলার রহিমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হান্নান হান্নুসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় জগনাথপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান লিটন চিৎকার করে বলতে থাকেন, “আপনারা কথায়-কথায় ওমুক সাহেব, তমুক সাহেব বাদ দেন। এখানে শরিফ সাহেব (জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক ও পৌর বিএনপির সভাপতি শরিফুল ইসলাম শরিফ) ও হামিদ সাহেবের (সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল হামিদ) কোনো প্যানেলের লোক আছে এগুলো দেখার টাইম নাই।”
তিনি আরও বলেন, “আলমগীর সাহেবকে (বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) গিয়ে বলেন, আপনার থেকেও বড় আলমগীর সাহেব…। রাস্তা করে দেবেন আপনি।” এ সময় পাশে থাকা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান হান্নু তাকে থামানোর চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “ওনারা (শরিফ-হামিদ) বড় নেতা পরিচয় দিলে অসুবিধা কি?” কিন্তু লিটন আরও ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “ওনারা কি ঠাকুরগাঁও শহরটা বিক্রি করে দিয়েছেন? ফোন করলেই শুধু হামিদ ও শরিফকে দেখায়।” এরপরও তিনি চিৎকার করতে থাকেন, যা উপস্থিত সবাইকে হতবাক করে দেয়।
এই ঘটনার ১ মিনিট ২২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. আব্দুল হামিদ ভিডিওতে মন্তব্য করে লেখেন, “উঁচু গলা বলে দিচ্ছে চিটার, ধান্দাবাজ। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে মৃত ব্যক্তি থেকে ডিভোর্সের টাকা পর্যন্ত চিট করা হয়নি। তাঁর গলা উঁচু করে ধান্দা বাড়াতে চায়।” একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বিএনপি ক্ষমতায় গেলে উনিই ঠাকুরগাঁওয়ে বেশি খবরের শিরোনাম হবেন।” অন্য একজন মন্তব্য করেছেন, “বিএনপির পক্ষে না থেকে উনি তো আওয়ামী লীগের পক্ষে ভোট চেয়েছিলেন!”
এদিকে, বিএনপির অনেক নেতাও তার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম শরিফ বলেন, “লিটন ধান্দাবাজ, অর্থের লোভে এসব করছে। দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন আচরণ করা উচিত নয়।” জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদ এলাকার একটি রাস্তার কাজ ঠিকভাবে না হওয়ায় লিটন ক্ষুব্ধ হন। স্থানীয় এক ঠিকাদার সামাদকে লক্ষ্য করে তিনি গালিগালাজ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির নেতা আব্দুল হামিদের সুপারিশে সামাদ ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি যথাসময়ে কাজ শেষ করেননি। তবে এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান লিটন বলেন, “রাস্তার কাজ টেন্ডার হওয়ার পর সামান্য কাজ করে সেটি ৫-৭ মাস ফেলে রাখা হয়েছে। ফোন করলেও ঠিকাদার ফোন ধরেন না। এলাকার মানুষের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। আমি উপজেলা পরিষদে গিয়ে ঠিকাদারকে দেখতে পাই, তখন জনস্বার্থে কথাগুলো বলেছি। এটি নিয়ে অতিরঞ্জিত করার কিছু নেই।”
এ বিষয়ে সামাদ ঠিকাদারের ম্যানেজার মনির হোসেন জানান, বিএনপি নেতা আব্দুল হামিদের সুপারিশে কাজটি সামাদ নিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি পরে অন্যদের কাছে বিক্রি করেন।
মোস্তাফিজুর রহমান লিটনকে নিয়ে এর আগেও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলেও তিনি আওয়ামী লীগ নেতা অরুণাংশু দত্তের পক্ষে প্রচারণা চালান। সে সময় বিএনপি তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেও কার্যত কিছুই করা হয়নি।
২০২২ সালের ইউপি নির্বাচনে মোস্তাফিজুর রহমান আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী মো. আলাউদ্দিনকে হারিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই তিনি নানা বিতর্কের জন্ম দেন।
বিএনপির নেতাকর্মীদের দাবি, লিটনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, না হলে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হবে। তবে দল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়নি।
ঠাকুরগাঁও বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। মোস্তাফিজুর রহমান লিটনের সাম্প্রতিক ভিডিও সেই দ্বন্দ্বকে আরও উসকে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়।
Related