
ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ থেকে হঠাৎ করে পানি ছেড়ে দেওয়ায় তিস্তা নদীর পানি আকশ্যিকভাবে বেড়ে যায় । এতে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তা নদীতীরবর্তী কয়েকটি ইউনিয়নের চর ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে চরশংকরদহ, বিনবিনা, পশ্চিম ইচলী, গজঘন্টা, মটুকপুর ও নোহালী ইউনিয়নের শত শত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ডুবে গেছে, দেখা দিয়েছে তীব্র দুর্ভোগ।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, মঙ্গলবার (৩০ জুলাই) সকাল ৯টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানির স্তর ছিল ৫২.২০ মিটার, যেখানে বিপদসীমা ৫২.১৫ মিটার। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও পানি ছিল বিপদসীমার নিচে।
নোহালী ইউনিয়নের চরমিনার বাজার এলাকার আব্দুল মান্নান বলেন, হঠাৎ পানি আসি বাড়ি-ঘর ডুবি গেল। প্রতি বছরই এমন হয়, কোন খবরেই পাই না হঠাৎ বন্যা হয়। আনন্দ বাজার, শখ বাজার এলাকাতে প্রায় বাড়ি ডুবে গেছে।
কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনা এলাকার জামাল মিয়া বলেন, ঘুম থেকে উঠে দেখি ঘরে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। গরু বাছুর নিয়ে খুব বিপদে পড়েছি। সব জায়গা ডুবে গেছে কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চরশংকরদহ গ্রামের কৃষক জাহেদুল ইসলাম বলেন, ভারত আমাদের বন্যায় ডুবিয়ে মারে, আবার খরায় শুকিয়ে মারে। দুই মাস আগে খরায় ফসল হয়নি, আর এখন অতিরিক্ত পানিতে জমি ডুবে গেছে।
তিস্তার পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পানিতে ডুবে গেছে বসতঘর, গবাদিপশুর খাবার নিয়ে খুব বিপদে পড়েছি। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
গৃহবধূ হাসিনা বেগম বলেন, রাতের আঁধারে পানি এসে ঘরে ঢুকে পড়ে। কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। মেয়ের স্কুলব্যাগসহ সব ভেসে গেছে।
রিকশাচালক রবিউল ইসলাম বলেন, রাস্তায় পানি, ঘরেও পানি। রিকশা চালাতে পারছি না, আয়ও বন্ধ। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।শুধু বর্ষায় বন্যা নয়, শীত মৌসুমে তিস্তায় দেখা দেয় চরম খরা। কৃষক হাফিজুল ইসলাম জানান,জানুয়ারিতে ৮ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলাম, কিন্তু ভারত পানি দেয়নি বলে সব নষ্ট হয়ে গেছে।
এই অনিয়মের জন্য ভারতের একতরফা পানি ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন,তিস্তা এখন আর আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ হয়ে গেছে। ভারত যখন খুশি পানি ছেড়ে দেয়, আবার যখন খুশি আটকে রাখে। তিনি আরও বলেন, এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই পেতে হলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে একটি টেকসই ও ন্যায্য পানি বণ্টন চুক্তি এখনই প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সাল থেকে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চললেও এখনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। ফলে প্রতিবছর বর্ষা ও খরায় সীমান্তবর্তী এলাকার কৃষক ও বাসিন্দারা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
সাবেক শিক্ষক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক আব্দুল মালেক বলেন,সরকার বলছে আলোচনা চলছে, কিন্তু বাস্তবে আমাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসছে না। তিস্তা চুক্তি না হলে এই অঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাবে।”
এ বিষয়ে গঙ্গাচড়া উপজেলার ইউএনও মো. মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের পরিবারের তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে । তাদেরকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। তবে এই সমস্যা সমাধানের জন্য পানি চুক্তি সমঝোতা স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
Related