


ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে শয্যা সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকছেন। একদিকে জনবল সংকট, অন্যদিকে অপ্রতুল অবকাঠামো—এই দুইয়ের চাপে স্বাস্থ্যসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সাধারণ মানুষের অসচেতনতাকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বুধবার ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মোঃ এনামুল হক বলেন, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে। হাসপাতালকে নিজের সম্পদ মনে করে এর পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই।
পরিদর্শনকালে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীর উপচে পড়া ভিড় এবং মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়ার চিত্র দেখেন মহাপরিচালক। তিনি বলেন, “২৫০ শয্যার হাসপাতাল যখন ফাংশনিং শুরু করেছে, এখন ৪০০-৫০০ শয্যার মতো রোগী চলে আসছে। মেডিসিন ওয়ার্ডে মেঝেতে রোগী শুয়ে আছে। এই চিত্র শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের নয়, রংপুর, ময়মনসিংহ এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও একই অবস্থা।”
এই সংকটের কারণ হিসেবে তিনি জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “আমাদের রোগের প্রবণতা বেড়েছে, জীবন আচরণে অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে, খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। এর অনেকগুলোই আমরা প্রতিরোধ করতে পারতাম। স্বাস্থ্যের সঠিক শিক্ষা বা হেলথ এডুকেশনের অভাবে সাধারণ কারণেই আমরা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আসছি। মন্ত্রণালয় বিষয়টি মাথায় রেখেছে।”
হাসপাতালটি ১০০ থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও সে অনুযায়ী জনবল এখনো নিয়োগ হয়নি বলে স্বীকার করেন ড. এনামুল হক। তিনি বলেন, “অর্গানোগ্রাম অ্যাপ্রুভ হয়েছে, কিন্তু এখনো সব পদ ফিলাপ হয়নি। কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে লিখছেন, ধীরে ধীরে হয়তো পূরণ হয়ে যাবে।”
শিশু ওয়ার্ডের সংকীর্ণতা এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, “শিশু ওয়ার্ডের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা হচ্ছে না। আমি নিজে দেখেছি, এর রিনোভেশন প্রয়োজন। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরকে চিঠি দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছি।” তবে হাসপাতালের নবজাতকদের জন্য বিশেষায়িত সেবা ইউনিটের (স্ক্যানু) কার্যক্রমে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাদের ফাংশন খুব ভালো এবং সেবাপ্রার্থীরাও খুশি।”
হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে মহাপরিচালক বলেন, “হাসপাতাল শুধু রোগীদের নয়, এখানে চিকিৎসক-নার্সরা ২৪ ঘণ্টা সেবা দেন। একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তাদের জন্যও জরুরি। আমি ঢোকার সময় দেখলাম, একটি চিপসের প্যাকেট সুন্দর পরিষ্কার জায়গায় ফেলা আছে, যদিও পাশেই বিন ছিল। এই ছোট ছোট বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “হাসপাতাল এটা সবারই। আপনার, আমার, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। এটি পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব যেমন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের, তেমনি একজন নাগরিক হিসেবে আমারও দায়িত্ব আছে। আমরা যদি নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলি, তাহলেই পরিবেশ অনেক উন্নত হয়।”
জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আপনারা (গণমাধ্যম) এ ক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারেন। আপনাদের ফিডব্যাক আমাদের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সুন্দর স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ তৈরি করতে পারব।”
উল্লেখ্য, ড. মোঃ এনামুল হক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন বিষয়ক একটি কর্মশালায় অংশ নিতে ঠাকুরগাঁও সফর করছেন। তিনি জানান, তার ইউনিট স্বাস্থ্য খাতের পলিসি, গবেষণা এবং সেবার মানোন্নয়ন নিয়ে কাজ করে।