


সাধারণ রোগীর বেশে তাঁরা মিশে গিয়েছিলেন হাসপাতালের ভিড়ে। কথা বলছিলেন সেবা নিতে আসা অসহায় মানুষগুলোর সাথে। পরিচয় গোপন রেখে যখন অনিয়মের সত্যতা মিলল, তখনই বেরিয়ে এলো আসল রূপ! দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এমন এক অভিনব অভিযানে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ হাসপাতালে দুর্নীতির থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে, যেখানে ওষুধ চুরি থেকে শুরু করে কর্তার ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো ঘটনাও রয়েছে।
রোগীদের জন্য নিম্নমানের খাবার, ওষুধ থাকা সত্ত্বেও বিতরণ না করা, যন্ত্রপাতির বেহাল দশা এবং প্রধান কর্মকর্তার কর্মস্থলে না থেকে সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে এমন নানা অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) বিকেলে দুদকের সমন্বিত ঠাকুরগাঁও জেলা কার্যালয়ের একটি দল এই ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, পীরগঞ্জের ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই সরকারি হাসপাতালটিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ আসছিল। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আজমির শরিফ মারজীর নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট দল অভিযান চালায়। অভিযানের শুরুতে দলের সদস্যরা ছদ্মবেশে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বিভাগ ঘুরে দেখেন। তাঁরা রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে সেবার মান পর্যবেক্ষণ করেন।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর দুদক কর্মকর্তারা নিজেদের পরিচয় দেন এবং হাসপাতালের বিভিন্ন রেকর্ডপত্র যাচাই শুরু করেন। এ সময় তাঁরা দেখতে পান, রোগীদের জন্য যে খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের এবং নির্ধারিত ডায়েট চার্ট অনুসরণ করা হচ্ছে না। হাসপাতালের বহির্বিভাগের ওষুধের স্টোররুমে গিয়ে দেখা যায়, গত দুই মাস ধরে ওষুধ বিতরণের রেজিস্টার হালনাগাদ করা হয়নি। অথচ মজুত থাকা সত্ত্বেও অনেক রোগীকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযানকালে আরও দেখা যায়, রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। কিছু যন্ত্রপাতি সচল থাকলেও সেগুলো দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গেলে মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা রোগীদের হয়রানি করেন বলেও প্রমাণ পায় দুদক।
এ ছাড়া, ওষুধের মজুত রেজিস্টার যাচাইকালে বিভিন্ন অসংগতি পাওয়া যায়, যার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি দায়িত্বরত নার্স ইনচার্জ।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. মো. আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে। নিয়ম অনুযায়ী তাঁর কর্মস্থল পীরগঞ্জে থাকার কথা থাকলেও তিনি ঠাকুরগাঁও শহরে বসবাস করেন। প্রতিদিন তিনি সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে অফিস করেন, যা সরকারি সম্পদের অপচয় বলে মনে করছে দুদক।
অভিযান শেষে দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আজমির শরিফ মারজী বলেন, “আমরা ছদ্মবেশে ও পরে প্রকাশ্যে অভিযান পরিচালনা করে বেশ কিছু অনিয়ম পেয়েছি। রোগীদের খাবার, ওষুধ বিতরণ ও রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা স্পষ্ট। আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সেবার মান উন্নত করার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছি। সংগৃহীত রেকর্ডপত্র যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল জব্বার বলেন, “দুদক যেসব অনিয়মের কথা বলেছে, সেগুলোর বিষয়ে আমরা লিখিতভাবে জবাব দেব।” তবে কর্মস্থলে না থেকে সরকারি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি একই উত্তর দেন।