


জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন ইসলামে বিশেষ মর্যাদার। এই সময়ে কোরবানির নিয়তকারীদের জন্য নখ ও চুল না কাটার একটি বিশেষ সুন্নাহ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনে নানা প্রশ্ন থাকে। নিচে দলিলসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হলো।
১. বিধানের দলিল কী?
উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যখন তোমরা জিলহজ মাসের নতুন চাঁদ দেখতে পাও আর তোমাদের কেউ কোরবানি করার ইচ্ছা করে, সে যেন তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।’ (সহিহ মুসলিম: ৪৯৫৭, ইফা)
এই হাদিসের ভিত্তিতে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, কোরবানিদাতার জন্য এটি মোস্তাহাব বা উত্তম আমল। এর মাধ্যমে একজন মুমিন তার পুরো অস্তিত্ব নিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির অপেক্ষায় থাকেন।
২. এই বিধান কার জন্য?
এটি কেবল সেই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য, যিনি নিজে কোরবানি দেবেন বা যার পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া হচ্ছে। পরিবারের অন্য সদস্য, যারা কোরবানির নিয়তকারী নন, তাদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক নয়, তবে সওয়াবের আশায় পালন করলে বাধা নেই। ইমাম নববী (রহ.)-সহ অধিকাংশ আলেম এ মতের পক্ষে।
৩. সময়সূচি: কখন থেকে শুরু করবেন?
জিলহজের চাঁদ ওঠার মুহূর্ত থেকে এই বিধান শুরু হয় এবং কোরবানি সম্পন্ন করার সাথে সাথে শেষ হয়। বাংলাদেশে এ বছর (২০২৬) জিলহজের চাঁদ দেখা যেতে পারে ১৮ মে (সোমবার) দিবাগত রাতে। তাই যারা এই আমল পালন করতে চান, তাদের আজ সন্ধ্যার আগেই নখ, চুল, গোঁফ ও শরীরের অবাঞ্ছিত পশম পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।
৪. নখ-চুল কেটে ফেললে কি কোরবানি নষ্ট হয়?
না, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। কেউ ভুলে বা অজ্ঞতাবশত নখ-চুল কেটে ফেললে তার কোরবানি বাতিল হয় না এবং কোনো কাফফারাও দিতে হয় না। তিনি কেবল একটি ফজিলতপূর্ণ সুন্নাহ থেকে বঞ্চিত হলেন। এ ছাড়া ‘এই আমল না করলে সারা বছর অকল্যাণ হবে’—এ ধরনের ধারণার কোনো দলিল নেই, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
৫. বিশেষ পরিস্থিতিতে করণীয়
ইসলামে ৪০ দিনের বেশি নখ বা অবাঞ্ছিত পশম না কাটা নিষিদ্ধ (সহিহ মুসলিম: ২৫৮)। তাই জিলহজ মাস এলেও যদি ৪০ দিন পূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তখন পরিচ্ছন্নতার বিধান অগ্রাধিকার পাবে। সবচেয়ে ভালো হলো চাঁদ ওঠার আগেই প্রয়োজনীয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সেরে নেওয়া, যা এ বছর আজই করার সুযোগ রয়েছে।
৬. যারা কোরবানি দিতে পারবেন না, তাদের জন্য সুসংবাদ
সামর্থ্য না থাকায় অনেকে কোরবানি দিতে পারেন না। তাদের জন্যও একটি বিশেষ সুযোগ রয়েছে। কোনো কোনো আলেম বলেন, যে ব্যক্তি কোরবানি দিতে অক্ষম, তিনি যদি জিলহজের প্রথম দশ দিন চুল, নখ ও শরীরের পশম না কেটে ঈদের দিন তা পরিষ্কার করেন, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে পূর্ণ কোরবানির সওয়াব দান করতে পারেন। (সুনানে আবু দাউদ: ২৭৮৯; আলবানি (রহ.) হাদিসটিকে হাসান বলেছেন)
অর্থাৎ দারিদ্র্য বা অসামর্থ্য কোনো মুমিনকে এই মহান ইবাদতের ফজিলত থেকে বঞ্চিত করে না। নিয়ত ও আমলের মাধ্যমে তিনিও কোরবানিদাতার কাছাকাছি সওয়াব অর্জন করতে পারেন।
কোরবানির আগে নখ-চুল না কাটা স্রেফ একটি বাহ্যিক আমল নয়। এটি হাজিদের ইহরামের সাথে সাদৃশ্যের একটি প্রতীকী প্রকাশ- যেন ঘরে থেকেও মুমিন আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সাথে একাত্ম হন। তাই চাঁদ ওঠার আগেই প্রস্তুতি নিন এবং এই সুন্নাহটি যথাসাধ্য পালন করুন।