


পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিবছরের মতো এবারও সারা দেশে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় চাল বিতরণ করছে সরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগ, উৎসব কিংবা সংকটকালে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সাময়িক খাদ্য সহায়তা প্রদান করা। তবে প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই চাল বিতরণকে কেন্দ্র করে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক সুপারিশ এবং একই ব্যক্তির নামে একাধিক কার্ড নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নে এবার দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। রাজনৈতিক ভাগ-বাটোয়ারার পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে সমাজভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন করে ভিজিএফ বিতরণে নতুন মডেল দাঁড় করিয়েছেন তাম্বুলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ মুকুল। স্থানীয়দের দাবি, এই পদ্ধতিতে প্রকৃত দরিদ্রদের হাতে সরকারি সহায়তা পৌঁছেছে এবং আগের তুলনায় অভিযোগও অনেক কমেছে।
ভিজিএফ কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও পুরোনো পদ্ধতির অভিযোগ:
সরকার সাধারণত ঈদ, পূজা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য দুর্যোগকালে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভিজিএফ কর্মসূচি চালু করে। ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে তালিকা প্রস্তুত করে নির্ধারিত উপকারভোগীদের মাঝে চাল বিতরণ করা হয়। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধানে এ কার্যক্রম পরিচালিত হলেও বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতে ইউনিয়নভিত্তিক ভিজিএফ কার্ড বণ্টনে রাজনৈতিক দল, জনপ্রতিনিধি এবং প্রভাবশালী মহলের মধ্যে অলিখিত ভাগ-বাটোয়ারার সংস্কৃতি চালু ছিল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি কার্ড পেতেন। আবার অনেক প্রকৃত অভাবী ব্যক্তি কোনো সহায়তাই পেতেন না।
তাম্বুলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ বলেন, আগে কার্ড পাইতে গেলে নেতা ধরতে হইত। অনেক সময় নাম দিছি, কিন্তু চাল পাই নাই। এবার মসজিদ কমিটির মাধ্যমে নাম উঠছে, চালও পাইছি।
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা শেফালী বেগম বলেন, আগে যারা প্রভাবশালী ছিল তারাই বেশি সুবিধা পাইত। এবার ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে খোঁজ নিয়ে তালিকা করায় গরিব মানুষ উপকার পাইছে।
প্রকাশ্যে ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকা প্রকাশ:
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাম্বুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ এবার ভিন্ন আরেকটি উদ্যোগও নেয়। চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ মুকুল নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ওয়ার্ডভিত্তিক ভিজিএফ উপকারভোগীদের ক্রমিক নম্বর প্রকাশ করেন এবং গুগল ড্রাইভের লিংকের মাধ্যমে তালিকা উন্মুক্ত করে দেন।
ফেসবুকে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ১ নম্বর ওয়ার্ডের উপকারভোগীদের ক্রমিক নম্বর ১ থেকে ৬৭০, ২ নম্বর ওয়ার্ডে ৬৭১ থেকে ১৪০৪, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ১৪০৫ থেকে ২০৭৪, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে ২০৭৫ থেকে ২৮০৮, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ২৮০৯ থেকে ৩৫৪২, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৩৫৪৩ থেকে ৪২১২, ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ৪২১৩ থেকে ৪৯৮২, ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ৪৯৮৩ থেকে ৫৬৫২ এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ৫৬৫৩ থেকে ৬৩৮৬ পর্যন্ত তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রকাশ্যে তালিকা উন্মুক্ত করায় কে কার্ড পেয়েছেন তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব হয়েছে। এতে গোপন তালিকা বা পছন্দের ব্যক্তিকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগও কমেছে।
যেভাবে করা হলো নতুন সমাজভিত্তিক তালিকা:
তাম্বুলপুর ইউনিয়নে এবার ৬ হাজার ৩৮৬ জন কার্ডধারীর প্রত্যেককে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ মুকুল প্রতিটি ওয়ার্ডে বিশেষ কমিটি গঠন করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভিজিএফ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাম্বুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ এবার প্রতিটি ওয়ার্ডে বিশেষ কমিটি গঠন করে। এসব কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্যদের পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়া প্রতিটি ওয়ার্ডের মসজিদ কমিটির সভাপতি এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সুবিধার্থে মন্দির কমিটির সভাপতিদেরও কমিটিতে রাখা হয়। তবে রাজনৈতিক নেতাদের কোনো ব্যক্তিগত কোটা না দিয়ে শুধুমাত্র যাচাই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত রাখা হয়।
কমিটির সদস্যরা ওয়ার্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে প্রকৃত হতদরিদ্র পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করেন। যেহেতু প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত, তাই তালিকা থেকে প্রকৃত অভাবী মানুষ বাদ পড়ার সুযোগ কমেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
রাজনৈতিক চাপ এড়াতে চেয়ারম্যানের ভিন্ন কৌশল:
স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের রাজি করানো শুরুতে সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ মুকুল। তিনি বলেন, আগের মতো রাজনৈতিক ভাগে কার্ড দিলে অনেক নেতা-কর্মী অসন্তুষ্ট থাকতেন। কারণ সবার হাতে কার্ড পৌঁছানো সম্ভব হতো না। এবার আমরা বলেছি, কোনো দলের ব্যক্তিগত কোটা থাকবে না। সমাজভিত্তিক যাচাই হবে। এতে নেতারাও চাপমুক্ত থাকবেন।
তিনি আরও বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি প্রকৃত দরিদ্রদের খুঁজে বের করতে। একই ব্যক্তি যেন একাধিকবার সুবিধাভোগী হতে না পারেন, সেটিও যাচাই করা হয়েছে।
তাম্বুলপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আহাম্মদ হোসেন বলেন, শুরুতে কিছু দ্বিধা ছিল। পরে দেখি, এই পদ্ধতিতে ঝামেলা কমেছে। সাধারণ মানুষও সন্তুষ্ট। কেউ অনিয়ম করার সুযোগ পায়নি। এ পদ্ধতিতে শতভাগ সফলতা এসেছে বলে আমি মনে করি। ওয়ার্ড পর্যায়ের এক মসজিদ কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, আমরা এলাকার মানুষকে চিনি। কে প্রকৃত গরিব সেটা যাচাই করা সহজ হয়েছে। তাম্বুলপুর সার্বজনীন মন্দিরের সভাপতি হরিশ চন্দ্র বলেন, এবার সমাজভিত্তিক বিতরণে ব্যাপক সাড়া মিলেছে। হতদরিদ্র প্রায় সবাই কার্ড পেয়েছে। গ্রাম পুলিশ আম্বার আলী বলেন, এক মাস আগেই চেয়ারম্যান আমাদের হতদরিদ্র তালিকা তৈরির জন্য ফরম দিয়েছিলেন। সেভাবেই জরিপ করা হয়েছে।
অভিযোগ কমে সন্তুষ্ট সাধারণ মানুষ:
স্থানীয়দের দাবি, অতীতে ভিজিএফ বিতরণের সময় ইউনিয়ন পরিষদে ভিড়, অভিযোগ ও উত্তেজনা তৈরি হতো। কিন্তু এবার তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ পরিবেশে চাল বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। তাম্বুলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নুর ইসলাম বলেন, ‘আগে শুনতাম কার্ড নিয়ে অনেক ঝামেলা হয়। এবার তেমন কিছু দেখি নাই। যারা দরিদ্র, তারা অনেকেই চাল পাইছে।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, চাল বিতরণ করে আমরা অনিয়ম না করলেও মানুষ আমাদের চোর বলত। তাই মানুষ যা-ই বলুক, এবার এই পদ্ধতিতে চাল বিতরণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। আমি খুশি, কারণ আগে যে পরিমাণ কার্ড ভাগে পেতাম তা দিয়ে সব হতদরিদ্রকে সহায়তা করা সম্ভব হতো না। এখন প্রায় সব হতদরিদ্র পরিবার কার্ড পেয়েছে। স্লিপ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ নেই।
তবে এত সন্তুষ্টির পরও ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবু জাফর জুয়েলের বিরুদ্ধে তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি চেয়ারম্যান বজলুর রশিদ মুকুলের নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিছু ওয়ার্ডে বরাদ্দের তুলনায় প্রকৃত হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা কম থাকায় উদ্বৃত্ত কার্ড অন্য ওয়ার্ডে সমন্বয় করা হয়েছে। এতে অপচয় কমেছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রাজনৈতিক সুপারিশের পরিবর্তে সমাজভিত্তিক যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে ভিজিএফ কর্মসূচিতে অনিয়ম অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাম্বুলপুর ইউনিয়নের এই পদ্ধতি অন্যান্য ইউনিয়নের জন্যও একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
পীরগাছা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, নিয়মের মধ্যে থেকেই তাম্বুলপুরে হতদরিদ্র বাছাই করা হয়েছে। ভিজিএফ বিতরণে অন্য ইউনিয়নে নানা অভিযোগ থাকলেও তাম্বুলপুর ইউপিতে এবার কোনো অভিযোগ নেই। সুষ্ঠুভাবে অধিকাংশ হতদরিদ্র পরিবার ভিজিএফ সহায়তা পেয়েছে।
পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, ‘৯টি ইউনিয়নের মধ্যে তাম্বুলপুরে ভিন্নভাবে বিতরণ চলছে। চেয়ারম্যান বিতরণ পদ্ধতিতে নতুন কিছু সংযোজন করলেও নীতিমালার বাইরে নয়। নীতিমালা পরিপন্থি কোনো কাজ না হওয়ায় আমাদের সায় রয়েছে। আমরা এখানে এসে দেখলাম ভালোভাবে বিতরণ হচ্ছে। যদি সফল হয়, তাহলে পরবর্তীতে অন্য ইউপিতেও এভাবে বিতরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।