


ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, উৎসবমুখর পরিবেশ ও ব্যাপক জনসমাগমের মধ্য দিয়ে প্রায় দুই শতাধিক বছরের ঐতিহ্য বহনকারী দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঋষিঘাট বারুণী গঙ্গাস্নান মেলা।
বুধবার মেলার দিন ভোর থেকেই পূণ্যার্থীদের ঢল নামে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্র স্নানের মাধ্যমে পাপমুক্তি ও আত্নশুদ্ধির আশায় ভক্তরা গঙ্গাস্নানে অংশগ্রহণ করেন। স্নান শেষে তারা পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। ভক্তদের ধর্মীয় সংগীত, কীর্তন ও ভজন পরিবেশনের মধ্য দিয়ে পুরো এলাকা এক ভক্তিময় আবহে পরিণত হয়। মেলা প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট, হস্তশিল্পের সামগ্রী, খেলনা, মিষ্টি ও খাবারের স্টল বসানো হয়। শিশু-কিশোরদের জন্য ছিল নানা ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা।
ফলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলাটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নেয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে আগত দর্শনার্থীরা মেলার বিভিন্ন কার্যক্রম উপভোগ করেন। মেলা আয়োজক কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, বারুণী গঙ্গাস্নান মেলা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি এলাকার শতবর্ষী ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক। প্রতিবছর এ মেলায় বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।
মেলায় আগত দর্শনার্থীরা বলেন, এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী মেলা দেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা ভবিষ্যতেও এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। তারা আরও বলেন, উৎসবমুখর পরিবেশ, ব্যাপক জনসমাগম ও শান্তিপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বছরের বারুণী গঙ্গাস্নান মেলা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
মেলায় অংশগ্রহণকারী ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আয়োজকদের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং আগামী বছর আরও বৃহৎ পরিসরে এ মেলা আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
মেলাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে।
পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খোঁজখবরের জন্য বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই মেলা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।
আইন শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বারুণী গঙ্গাস্নান মেলা পরিদর্শন করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবানা তানজিন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল আল মামুন কাওসার শেখ, ঘোড়াঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শহিদুল ইসলাম। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ মিয়া, সিংড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন এবং উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মনোরঞ্জন মোহন্ত ভুট্টু।
বিষয়টি নিয়ে ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, মেলায় আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবানা তানজিন বলেন, দুই শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী এ বারুণী গঙ্গাস্নান মেলা ঘোড়াঘাটের সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২শ বছরের অধিক প্রাচীন এ মেলা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্রই নয়, বরং এ অঞ্চলের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবে পরিচিত।