রনজিতেশ্বর গ্রামের আবেদ তেলি অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। জীবিকা নির্বাহের জন্য রয়েছে ছোট একটি দোকান। পাশাপাশি সাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ফলমূলের গাছে ওষুধ দেওয়ার কাজ করেন। এসব কাজের আয়েই চলে তাঁর সংসার। তবে নিজের অভাব-অনটনের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে সময় দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
আবেদ তেলির চুল কাটার পদ্ধতিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কাঁচি,খুর কিংবা চিরুনি ছাড়াই শুধু একটি ব্লেড দিয়ে তিনি চুল কাটেন। ডান হাতে ব্লেড দিয়ে চুল কাটার সময় বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এই কাজটিতে তিনি দক্ষ হয়ে উঠেছেন।
প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের চুল কাটেন বলে জানান আবেদ তেলি। বিশেষ করে অর্থের অভাবে যারা নিয়মিত চুল কাটাতে পারেন না, তাদের অনেকেই তাঁর কাছে আসেন। কেউ নিজের পছন্দের ধরন বলে দিলে সেভাবেই চুল কেটে দেন তিনি।
আবেদ তেলি বলেন,ছেলে-পেলে আসে,আমাকে বলে ভালো করে কেটে দেন। যে যেভাবে চায়, আমি সেভাবেই তাকে দিয়ে দেই। অনেক খুশি হয়ে যায়। তাঁর এই কাজের শুরু প্রায় ৩৫ বছর আগে। সেই ঘটনার কথা বলতে গিয়ে আবেদ তেলি বলেন,এক ছেলে স্কুলে গিয়েছে,তার মাস্টার চুল ধরি টান দিয়েছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলি আসছে। বললাম,বাবা কাদিস কেন? সে বলল, আমার চুল ধরি স্যার টানছে। বললাম,চুল কাটি নিতে পারোনা? বললো,আমার পয়সা নাই,আমার আব্বারও পয়সা নাই। সেদিন একটি ব্লেড নিয়ে আসি চুল কাটা আরম্ভ করি। সেদিন থেকেই কোন ধরনের ট্রেনিং ছাড়া আমার চুল কাটা শুরু।”
এরপর থেকে আর থামেননি তিনি। গ্রামের অনেক দরিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে সময়মতো চুল কাটাতে পারেন না। তাঁদের কাছে আবেদ তেলি হয়ে উঠেছেন ভরসার মানুষ। শুধু চুল কাটাই নয়, মানুষকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়েও সচেতন করেন তিনি। কারও মাথায় বড় ও অপরিচ্ছন্ন চুল দেখলে নিজ থেকেই চুল কাটার পরামর্শ দেন। সময়মতো নখ কাটা ও পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়েও কথা বলেন।
কেন কোনো পারিশ্রমিক না নিয়ে এত সময় ব্যয় করে এই কাজ করেন-জানতে চাইলে আবেদ তেলি বলেন,অপরিষ্কার লোক দেখতে ভালো লাগে না। অপরিষ্কার চুল ঝাকড়া-পাকড়া কেমন দেখা যায়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখলে আমার ভালো লাগে। আবেদের কাছে নিয়মিত চুল কাটান আহসান হাবীব । তিনি বলেন,ছোটবেলা থেকেই টাকা ছাড়াই আবেদ দাদার কাছে চুল কাটাই। আরেক চুল কাটানো ব্যক্তি শাহ আলম বলেন,টাকার অভাবে চুল কাটাতে না পারলে এটাই আমার শেষ ভরসা।”
প্রতিবেশী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন বলেন,অভাবের মধ্যেও অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা আবেদ তেলির রয়েছে, তা প্রশংসনীয়। সমাজে এমন উদ্যোগ আরও উৎসাহিত হওয়া প্রয়োজন।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে নিজের টাকা দিয়ে ব্লেড কিনে সেই ব্লেড দিয়ে মানুষের চুল কেটে যাচ্ছেন আবেদ তেলি। নিজের সামর্থ্য সীমিত হলেও মানুষের পরিচ্ছন্নতা ও ভালো লাগার কথা ভেবে বিনা পারিশ্রমিকে সময় দেন তিনি। রাজারহাটের নিভৃত গ্রামের এই মানুষটির ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আজও অর্থের অভাবে চুল কাটাতে না পারা মানুষের জন্য হয়ে আছে এক নির্ভরতার জায়গা।