1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
‘নাটক’ নয়, তেল সরবরাহ নিশ্চিত করুন | দৈনিক সকালের বাণী
বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০১:৩৮ অপরাহ্ন

‘নাটক’ নয়, তেল সরবরাহ নিশ্চিত করুন

স্বপন চৌধুরী
  • আপলোডের সময় : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৩১ জন দেখেছেন

জ¦ালানি তেল সংকটকে ঘিরে জনজীবনে তৈরি হয়েছে নানামুখী সংকট। পরিনতিতে আয়-রোজগার ছেড়ে প্রয়োজনের তাগিদে লোকজন পাম্পে পাম্পে ছুটছেন অকটেন-পেট্রোলের খোঁজে। এতে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন স্থানে ঘটছে সংঘর্ষের ঘটনা। এমন পরিস্থিতিতে ঘাটতি মোকাবেলার উদ্যোগ না নিয়ে প্রশাসনের পক্ষে সাজানো হচ্ছে একের পর এক নাটক। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তেলের সংকট নেই। অন্যদিকে, বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন ধরনের ফরমান জারি করা হচ্ছে। কোথাও বলা হচ্ছে গাড়ির বৈধ কাগজপত্র ও হেলমেট ছাড়া তেল মিলবে না। কোথাও চালু করা হচ্ছে ফুয়েল কার্ড, পাম্পে পাম্পে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ট্যাগ অফিসার।

সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়েও ২০০ টাকার বেশি পেট্রোল মিলছেনা পাম্পগুলোতে। প্রকৃতপক্ষে সাজানো এসব নাটকেও কোনো কাজ হচ্ছে না। তেল অভাবে ৪০ শতাংশ মোটরসাইকেল অলস পড়ে থাকাসহ আয় কমে যাওয়ায় ক্রমেই জনগণের মাঝে বাড়ছে ক্ষোভ। যেকোনো সময় এই ক্ষোভের আগুন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মিডিয়ায় প্রকাশিত কবর থেকে জানা যায়, তেল সংকটে শুধু রংপুর নয়-রাজধানীসহ সারাদেশে অনেক পাম্প বন্ধ রয়েছে। যেসব পাম্পে পেট্রোল-অকটেন পাওয়া যাচ্ছে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থেকে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তাও ১০০ থেকে ২০০ টাকার তেল পাওয়ায় পরদিন আবারও ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল আরোহীদের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে কোনো না কোনো পাম্পে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ঈদের কারণে দুইদিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জ¦ালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পাম্প মালিকরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় জ¦ালানি তেলের সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে আতঙ্কিত ক্রেতাদের অতিরিক্ত জ¦ালানি কেনার প্রতিযোগিতাও বড় ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। যদিও বর্তমান সময়ে পাম্পগুলোতে সীমিত তেল দেওয়ায় তার কোনো সুযোগ নেই। তাছাড়া তেল মজুদকারীরা ধরাও পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, দেশে জ¦ালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। তিনি জনগণকে প্যানিক (আতঙ্কিত) না হওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, ‘সরকারের নেতৃত্বে ভর্তুকি দিয়েও তেল আমদানি অব্যাহত আছে। ঈদের কারণে দুইদিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় জনগণকে একটু চাপ পেতে হয়েছে। গত বছরের তুলনায় ২৫ ভাগ বেশি তেল আমদানি করা হচ্ছে। সবাই তেল পাবে, জনগণকে প্যানিক না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী তেল নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’ যদিও ঈদের ১০দিন পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি সেই তিমিরেই রয়েছে। তেলের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে সর্বত্র।

উত্তরের জেলাগুলোর ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে। তেলের সন্ধানে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ছুটছেন ভোক্তারা। কোথাও সীমিত পরিমাণ সরবরাহ এলেও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে তা পাচ্ছেন না। অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ লেখা নোটিস ঝুলছে। কোথাও অল্প পরিমাণ সরবরাহ এলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে উত্তেজনা ও বাকবিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে পাম্পগুলোতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। সেই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পুলিশ-প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির এক বার্তায় বলা হয়েছে ‘বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ইরান যুদ্ধের কারণে জ¦ালানি তেলের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়ে গেছে।

ডিপো থেকে পেট্রোলপাম্পগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী জ¦ালানি সরবরাহ করতে পারছে না। অন্যদিকে মোটরসাইকেল ও সাধারণ ভোক্তাদের ফিলিং স্টেশনে উপচে পড়া ভিড় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ ভোক্তা ও মোটরসাইকেলচালক কর্তৃক ফিলিং স্টেশনের কর্মীদের মারধর করা হচ্ছে। এমনকি ফিলিং স্টেশনে ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে, প্রতিনিয়ত এসব ঘটনা বেড়েই চলেছে। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে ফিলিং স্টেশন চালু রাখতে হবে। অন্যথায় কারো আদেশের অপেক্ষায় না থেকে ফিলিং স্টেশন পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েই স্টেশন চালাতে হবে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে ফিলিং স্টেশনের সব কর্মচারীকে নিরাপত্তা দিতে প্রশাসনের প্রতি জোর আহ্বান জানান ফিলিং স্টেশন মালিকরা। তবে বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, দেশে অকটেনের মজুদ পর্যায়ে কোনো সংকট নেই। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রতিদিন চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ অকটেন বিক্রি হয়েছে। এছাড়া আগামী ২ এপ্রিল ২৫ হাজার টনের একটি অকটেনবাহী কার্গো দেশে আসার কথা রয়েছে। ফলে সংকটের কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া সিআরইউ প্লান্টগুলো অকটেন উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। সেখানেও কোনো সংকটের খবর নেই।

মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ অনেকটা নতুন সংযোজন। এর বাইরে স্কুল-কলেজ ছাড়াও চাকুরি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে পরোক্ষভাবে আয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে মোটরসাইকেল। অথচ তেল অভাবে সেই মোটরসাইকেল অলস পড়ে থাকা মানেই আয় কমে যাওয়া-পেটে টান পড়া। সে কারণে বাধ্য হয়ে মানুষজন কাজ বন্ধ রেখে হলেও তেলের সন্ধানে পাম্পে পাম্পে ঘুরছেন। তবে সংকট উত্তোরণের পথ না খুঁজে সাধারণ মানুষের এমন দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন নতুন নতুন নাটক সাজাচ্ছেন। যা এসব মানুষের আয়-রোজগারের পথে কাটা হয়ে দাঁড়িছে। সড়কে অবৈধ যানবাহন চলবে না, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়। সেটা তদারকি করতে সুনির্দিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রয়েছে। তারপরও সড়কে নিরাপত্তা জোরদার ও অবৈধ মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ন্ত্রণে বৈধ কাগজপত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ও হেলমেট ছাড়া জ¦ালানি তেল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রংপুর জেলা প্রশাসন। অবৈধ সব ধরনের মোটরযানে জ¦ালানি তেল সরবরাহ না করতে পেট্রোল পাম্প, প্যাকড পয়েন্ট ও এজেন্সিগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া কোনো মোটরযান সড়ক, মহাসড়ক বা পাবলিক প্লেসে চালানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

আইনের ধারা ৪(১) ও ১৬(১) অনুযায়ী বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং রেজিস্ট্রেশন সনদ ছাড়া যানবাহন চালানো নিষিদ্ধ। একইসঙ্গে ধারা ২৫(১) অনুযায়ী ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস দিয়ে কোনো যানবাহন পরিচালনা করা যাবে না। আইনের বিধান প্রতিপালনের লক্ষে শুধু নিজ নামে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন সনদ, হালনাগাদ ট্যাক্স টোকেন, মোটরযান চালনার হালনাগাদ ড্রাইভিং লাইসেন্স, মানসম্মত হেলমেট, হালনাগাদ ফিটনেস সনদ ও হালনাগাদ রুট পারমিটসহ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) কাগজপত্রবিহীন মোটরসাইকেলসহ যে কোনো ধরনের মোটরযানে জ¦ালানি সরবরাহ না করার জন্য বিজ্ঞপ্তিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভূক্তভোগীরা জানান, ২০০ টাকার তেল পেতে ৪ থেকে ৫ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পাম্পে কাগজপত্র দেখে তেল দেওয়া মানেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা। ক্ষোভ প্রকাশ করে এসব ‘নাটক’ বাদ দিয়ে জ¦ালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানান। এর আগেও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলায় এমন নিষেধাজ্ঞা জারি করায় উত্তেজনা দেখা দেয়। তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ঠাকুরগাঁওয়ে জ¦ালানি সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসনের চালু করা ‘ফুয়েল কার্ড’ ব্যবস্থাও স্বস্তি আনতে পারেনি। বরং কার্ড সংগ্রহ করাকে ঘিরে নতুন করে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে গ্রাহকদের।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বিশ্বজুড়ে জ¦ালানি তেলের বাজারে। প্রতিদিন বাড়ছে দাম। চলমান উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ায় জ¦ালানির বৈশ্বিক সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে। এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে জ¦ালানি তেলের দাম ১০ শতাংশ বেড়েছে এবং সামনে আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশেও জ¦ালানি তেলের দাম বাড়বে এমন ধারণা ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, দেশে জ¦ালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়বে না। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিচার করেই জ¦ালানির বিকল্প বাজার উৎস খোঁজা হচ্ছে। তবে আমরা মনে করি, জ¦ালানির বিকল্প বাজার খুঁজলেই দীর্ঘমেয়াদে ভবিষ্যতের জটিলতা দূর হয় না। এ মুহূর্তে জ¦ালানি খাতের রূপান্তর জরুরি। জ¦ালানির বহুবিধ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকার পরও আমরা আমদানিনির্ভর।

সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশে বিগত এক দশকে জীবাশ্ম জ¦ালানি আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। দেশে প্রতি বছর জ¦ালানি তেল, কয়লা ও এলপিজিসহ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার জ¦ালানি পণ্য আমদানি করা হয়। নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই আমদানি বাড়ানোর কারণে এ খাত দিন দিন ঋণ ও দেনার ভারে জর্জরিত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিগত দুই দশকে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং একমুখী নীতি বাস্তবায়নের কারণে দেশের জ¦ালানি খাত ভঙ্গুর দশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশে। আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় ব্যাহত হচ্ছে জ¦ালানি নিরাপত্তা। আবার ভর্তুকির চাপ সামলানো সরকারের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতি বছরের শুরুতে এবং বাজেট ঘোষণার আগে জ¦ালানি রূপান্তরে, জ¦ালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং খরচ কমাতে নানা উদ্যোগের কথা আলোচনায় আসে। তবে এসব আলোচনা বাস্তব কর্মপদ্ধতির রূপ পায় না। বরং বিশ্ববাজারে প্রতিনিয়ত নানা সংকটের কারণে জ¦ালানির দাম হু হু করে বাড়ে। সংকট উত্তরণে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করেই জ¦ালানি রূপান্তরের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )