


রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ও কুর্শা ইউনিয়নের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে স্থাপিত উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র দুটি এখন নিজেই ‘পঙ্গু’ রোগীতে পরিণত হয়েছে।
জনগুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্র দুটির জরাজীর্ণ দশা আর অব্যবস্থাপনায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ইউনিয়ন পর্যায়ের এই চিকিৎসালয়গুলো এখন কার্যত অচল হয়ে যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কাগজ-কলমে এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বরত একজন মেডিকেল অফিসার ছ্যাকমো ১ জন , মিডওয়াইফ ১ জন এবং পিয়ন ১ জন নিযুক্ত থাকলেও তারা প্রভাব খাটিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডিউটি করছেন। ফলে মাঠপর্যায়ের এই কেন্দ্রগুলো বছরের পর বছর তালাবদ্ধ থাকছে। স্থানীয়রা জানান, জনবল নিয়োগ দেওয়া থাকলেও তারা কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। ফলে সাধারণ রোগীদের সামান্য জ্বরের চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করে উপজেলা শহর বা বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি ঝোপঝাড়ে জঙ্গল হয়ে আছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আঙিনা এখন গরু-ছাগলের চারণভূমি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় নষ্ট হয়ে গেছে শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থা। অভিযোগ উঠেছে, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামে নিয়মিত সরকারি ওষুধ বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হলেও তা সাধারণ রোগীদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে না। এই বরাদ্দকৃত ওষুধের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অন্যদিকে উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি প্রায় একই অবস্থা।
মধুপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল কাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। ছোটখাটো অসুখে এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসি, কিন্তু সবসময় তালা ঝুলানো দেখি। ডাক্তার বা কর্মচারী কাউকে পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে অনেক দূরে হাসপাতালে যেতে হয়, এতে সময় ও টাকা দুটোই নষ্ট হয়।” রহিমা বেগম নামের আরেক বাসিন্দা জানান, “গর্ভবতী নারীদের জন্য এখানে মিডওয়াইফ থাকার কথা থাকলেও আমরা কাউকে পাই না। অনেক ঝুঁকি নিয়ে আমাদের অন্যত্র যেতে হয়।”
এদিকে বিষয়টি বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হলে নজরে আসে উপজেলা স্বাস্থ্য পঃপঃ কর্মকর্তার এর পর গত সপ্তাহে মধুপুর উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত (ছ্যাকমো) ফারহানা ইয়াসমিনকে সপ্তাহে তিন দিন দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিলো তিনি নিয়মমতো অফিস করেন না এছাড়া সরকারি বিধি তোয়াক্কা না করে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যান সকালে আসেন দুপুর একটার পূর্বে বাকি দিনগুলোতে অন্য জনকে দায়িত্ব পালনের কথা থাকলেও তারা কেউই নিয়ম মেনে কর্মস্থলে উপস্থিত থাকছেন না।
সরকারি বিধির তোয়াক্কা না করে তারা কেন্দ্রে দেরিতে আসেন এবং দ্রুত চলে যান বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এ বিষয়ে কাউনিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোঃ আহসান হাবিব জানান, আমি কয়েকদিন আগেই এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জয়েন করেছি, বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি, এছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শৌচাগার ও পানির ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও প্রাথমিকভাবে মধুপুর কেন্দ্রটি চালু করা হয়েছে। দ্রুত অবকাঠামো ও পানির ব্যবস্থা সংস্কার করে নিয়মমাফিক উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র দুটির সেবা নিশ্চিত করা হবে।
অন্যদিকে মধুপুর ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চলের গর্ভবতী মায়েদের নিরাপদ প্রসব ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি বড় ভরসা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, গত সপ্তাহে মধুপুর উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি নামমাত্র চালু করা হলেও সেখানে দায়িত্বরত মিডওয়াইফ কর্মস্থলে উপস্থিত থাকছেন না।
ফলে চরাঞ্চলের কয়েক শ’ গর্ভবতী নারী চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছেন। জরুরি প্রয়োজনে কেন্দ্রে এসে মিডওয়াইফ না পেয়ে তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে যেতে হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, কাগজে-কলমে সেবার কথা বলা হলেও বাস্তবে মিডওয়াইফের অনুপস্থিতির কারণে মাতৃকালীন প্রাথমিক চেকআপ ও পরামর্শ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রামীণ মায়েরা। তদারকির অভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি এখন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র দুটি কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন। নিয়মিত তদারকি বৃদ্ধি, কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ এবং বরাদ্দকৃত ওষুধের সঠিক বণ্টন করা না হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। উপজেলার এই ‘রোগাক্রান্ত উপ’ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কি পারবে আবার প্রাণ ফিরে পেতে? নাকি অবহেলা আর অযত্নে এভাবেই মুখ থুবড়ে পড়বে গ্রামীণ জনপদের শেষ ভরসাস্থল? সাধারণ মানুষ এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।