দোকানে ক্রেতা না থাকায় এক মনে পবিত্র কোরআন শরীফের সূরা পাঠ করছিলেন তিনি।চিপস কেনার জন্য তার কাছে চাওয়া হলে সূরা পাঠ ত্যাগ না করেই চিপস দেন তিনি। এরপরেই কথা হয় এই প্রতিবেদকের সাথে। সূরা পাঠ শেষ করে ওমেলা বেগম গল্পে গল্পে বলেন তার জীবন সংগ্রামের কথা। গৃহিণী থেকে ব্যবসায়ী হওয়ার গল্পটি বলেন ওমেলা।
বিয়ের পর সুন্দর ভাবে কাটছিল সংসার।এক মেয়ে এবং এক ছেলেকে নিয়ে সুখী সংসার ছিল ওমেলা বেগম ও গোলাম কিবরিয়া দম্পতির।
ওমেলা বলেন, আজ থেকে চার বছর আগে আমার স্বামী একটি বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন থেকেই শরীরে শক্তি পান না। দুর্ঘটনার আগে ভ্যান চালিয়ে তিনিই আমাদের সংসার চালাতেন। কিন্তু যখন তিনি আর ভ্যান চালাতে পারছিলেন না তখন আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে পড়ে।দুর্ঘটনার আগেই আমাদের বড় মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিছিলাম। আমার ছেলের বয়স তখন মাত্র ৮ বছর।ছেলেকে ও অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে খুবই সমস্যার মধ্যে পড়ে যাই।
প্রতিবেদকের সাথে এসব কথা বলতে বলতে অতীত স্মরণ করে ওমেলা বেগমের দুচোখ অশ্রুতে ছলছল করে। এরপর তিনি জানান স্বামীর মরণ ব্যাধির কথা।
বাবা যদি শুধু এই অসুস্থতা থাকতো তাও হতো। অসুস্থ হয়ে পড়ার কিছুদিন পরেই আপনার চাচার একটা টিউমার ধরা পড়ে। টাকা পয়সার অভাবে চিকিৎসা করতে পারি নাই তখন। কিন্তু এই টিউমারে যে ক্যান্সার হবে তা তো জানতাম না। যদি জানতাম তাহলে তো নিজের সবগুলো দিয়েই চিকিৎসা করতাম।এখন ক্যান্সার নিয়েই বেঁচে আছে আপনার চাচা। মাঝেমধ্যে চিকিৎসা করাই মাঝেমধ্যে করাতে পারি না। ঠিকমতো ওষুধও খাওয়া হয়না।
অতীতের এসব কষ্টকর গল্প প্রতিবেদককে জানাতে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে পড়েন ওমেলা বেগম।এরপর স্বামীর অসুস্থতার পরে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটা জানান।
যখন ক্যান্সার ধরা পরল তখন আর কোন কাজেই করতে পারত না আপনার চাচা।কিন্তু ছেলেটাকে নিয়ে তো সংসার চালাতে হবে, খেয়ে তো বেঁচে থাকতে হবে। এখানে আমাদের নিজের কোন জমি নেই, নিজের কোন বাড়িও নেই। মানুষের বাড়িতে আশ্রিত হয়ে থাকি।তখন কি করব না করব দিকবিতিক শূন্য হয়ে গেছিল আমার। আমিতো মহিলা মানুষ বাবা লেখাপড়াও জানি না, কিভাবে কি করব তা ভেবে পাচ্ছিলাম না।পরে একটা এনজিও থেকে ১০ হাজার টাকা লোন নেই।সেই টাকা দিয়ে এখন যে দোকানটা দেখছেন সেটা তৈরি করে কিছু মুদি দ্রব্য তুলি। তখন থেকেই এই দোকানটা করছি। আজ চার বছর হচ্ছে এই দোকানটা আমি এক হাত দিয়ে করছি।
রংপুর মহানগরীর ২৭ নাম্বার ওয়ার্ডের খামারপাড়া গ্রামের মতি বেকারি কারখানা সংলগ্ন এই ছোট্ট দোকানটিকে ওমেলা বেগম সাজিয়েছেন নিজের মতো করে। পুরো দোকান মিলে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার পণ্য থাকলেও ওমিলা বেগম এর কাছে এটি তার সারা জীবনের সঞ্চয়। ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে আবারও দোকানে পণ্য তোলেন তিনি।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বেচাকেনা করে ৩০০ টাকার মত উপার্জন হয়।এতেই তিনজনের পরিবারের খরচ চালাতে হয়। কোনরকম খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকলেও স্বামীর ঔষধ কেনার টাকা জোটে না। এজন্যই বেশিরভাগ সময় চিকিৎসা বন্ধ থাকে ক্যান্সারের রোগী স্বামীর।
ওমেলা বলেন , বাবা প্রতি সপ্তাহে ঔষধ কেনার জন্য ১৫০০ টাকার দরকার।দোকান থেকে যে টাকা আসে সেটা দিয়ে আমরাই খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারি না ঠিকমতো। এই টাকা দিয়ে কিভাবে চিকিৎসা করাবো। তারপরও মাঝেমধ্যে কিছু টাকা জমিয়ে চিকিৎসা করাই, ঔষধ কিনে আনি। এর আগে এখন পর্যন্ত কয়েক লাখ টাকা খরচ হয়েছে।সরকারি সহযোগিতা ও এর ওর কাছে নিয়ে সেই টাকা জোগাড় করেছিলাম। কিন্তু এখন ওই সামর্থ্য নাই।
সংগ্রামী ওমেলা বেগম জীবনের এত চড়াই-উৎরাই পার করার পরেও দমে যাননি। অসুস্থ স্বামীকে সুস্থ করার প্রত্যয়ে এবং ছেলেকে শিক্ষিত করতে হাল ধরেছেন সংসারের। মাথা উঁচু করে সমাজে বাঁচতে চান তিনি।ওমেলার স্বপ্ন ছেলেকে সুশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করার।
ওমেলা বেগমের স্বামীর চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা করতে চাইলে: 01755437259 নগদ