২০২৫ সালের এক উজ্জ্বল সকালে, ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে দেখা গেল এক ব্যতিক্রমী দৃশ্য। অন্যদের মতো স্বাভাবিক দৃষ্টি নিয়ে নয়, বরং এক ভাইয়ের হাতের ছোঁয়ায় নিজের স্বপ্নগুলো লিখছিল মহির। শ্রুতলেখক হিসেবে পাশে ছিল তারই ছোট ভাই মাসুদ রানা।
পঞ্চগড় জেলার পাঁচপীর উচ্চ বিদ্যালয় এর অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মাসুদ পরম মমতায় ভাইয়ের বলা প্রতিটি শব্দ খাতায় ধারণ করছিল। গণিত পরীক্ষা শেষে মাসুদের চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির ঝিলিক, “আমার হাত দিয়ে ভাই যদি ভালো করতে পারে, তবে শান্তি পাব।”
মহিরের এই অদম্য পথচলার শুরুটা সহজ ছিল না। কৃষক বাবা মিলন হোসেন ছেলের চোখের আলো হারানোর বেদনায় মুষড়ে পড়লেও, ছেলের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে নতুন করে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন।
নিজেই ছেলেকে মুখে মুখে পড়াতেন। বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তির অধিকারী মহিরও বাবার শেখানো সব পাঠ দ্রুত আয়ত্ত করে নিত। গ্রামের পাঠশালার গণ্ডি পেরিয়ে ২০১৭ সালে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হয় মহির। এরপর কেবলই এগিয়ে চলা।
জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠা মহিরের চোখেমুখে একটাই স্বপ্ন – লেখাপড়া শেষ করে স্বাবলম্বী হওয়া। ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে নিজের ভাগ্যকে নতুন করে লেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার। দৃষ্টিহীনতার কষ্ট বুকে চেপে রেখেও সে চায় তার সাফল্যের আলোয় আলোকিত হোক বাবা-মায়ের মুখ।
তাদের দীর্ঘদিনের দুঃখ ঘোচাতে চায়, কিছুটা হলেও ঋণ শোধ করতে চায় তাদের ভালোবাসার।
দু’চোখের আলো না থেকেও যে মনের আলোয় আলোকিত হওয়া যায়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ মহির। তার এই মুখর জীবনগাথা কেবলই একটি পরীক্ষা নয়, বরং সমাজের সকল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক সাহসী উচ্চারণ। মহিরের গল্প আমাদের শেখায়, ইচ্ছাশক্তি আর মনের জোর থাকলে সব বাধাই তুচ্ছ।