


দেশের একমাত্র উৎপাদনশীল দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) পাথর বিক্রি কম হওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছে। খনির তিনতলা ভবন পর্যন্ত ছুই ছুই করছে পাথরের মজুত। বর্তমানে খনির ২৫ টি ইয়ার্ডে পড়ে আছে প্রায় ৪২০ কোটি টাকার ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টন পাথর। প্রকল্পে পাথর উত্তোলন বাড়লেও বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে প্রতি মাসেই মজুতের পরিমাণ বাড়ছে।
এতে ব্যয় মেটাতে খনিটি পড়েছে দেনার মুখেও। দেশে বছরে পাথরের চাহিদা প্রায় ২ কোটি ১৬ লাখ টন। এরমধ্যে শুধু রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ২ হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার রেলপথে প্রতি বছর ১ কোটি (ঘনফুট) পাথর প্রয়োজন হয়। এছাড়া নদীশাসনসহ অন্যান্য সরকারি উন্নয়ন কাজে ব্যবহার হয় পাথর। এসব পাথরের সিংহভাগ আমদানি হয় ভারত, ভুটান ও ভিয়েতনাম ইন্দোনেশিয়া থেকে। খনি সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে দাবি, চুক্তিবদ্ধ ৮০/১২০ বোল্ডার ও ৪০/৬০ সাইজ পাথর বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ড না নেওয়ায় আগামী ২৫ মার্চ এর মধ্যে খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রকট হয়ে উঠেছে। খনি বন্ধ হলে প্রতিদিনই বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে প্রতিষ্ঠানটি। এতে সরকারের লাখ লাখ রাজস্ব আয় কমবে। উৎপাদন ব্যাহত হলে খনির আর্থিক সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
একনেকে বিল পাশ হওয়ার পরও মাগুরা প্রজেক্ট ও ঢাকা-জয়দেবপুর-টঙ্গি ডুয়েলগেজ প্রজেক্ট এনোসি এই প্রজেক্ট খনির পাথর ব্যবহার করছে না। স্থানীয়রা বলছেন, খনিতে প্রত্যক্ষভাবে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী, পরিবহন, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও হাজার হাজার মানুষ। উত্তোলন বন্ধ হলে তাঁদের আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। শুধু শ্রমিক নয়, পুরো এলাকার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মধ্যপাড়া খনি কর্তৃপক্ষ বলছে, মধ্যপাড়া খনির পাথরের মান ভালো হলেও আমদানির পাথরেই ঝোক বেশি। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে মধ্যপাড়ার পাথর ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এতে সরকার হারাচ্ছে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব। অন্যদিকে ধারদেনা করে খনির ঠিকাদারের বিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে। মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিটি ১৯৭৩-৭৪ অর্থ বছরে আবিষ্কারের পর ২০০৭ সালের ২৫ মে থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। মধ্যপাড়া খনি থেকে পাথর উত্তোলন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানিয়া ট্রেস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি)।
বর্তমানে তিন শিফটে দৈনিক সাড়ে ৫ হাজার টন পাথর উত্তোলন হচ্ছে। আর খনির উত্তোলিত এসব পাথর বিক্রির দায়িত্বে রয়েছে পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল)। এই খনির পাথর সরাসরি ক্রেতার কাছে বিক্রি করা হয় না। তাদের নির্ধারিত ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। বর্তমানে ১৬৫ জন ডিলার রয়েছেন। কিন্ত ৪০/৪৫ ডিলার খনির পাথর নিচ্ছে। খনি সূত্রে জানা যায়, গত জানুয়ারীতে ১ লাখ ৩০ হাজার মে.টন ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৮৪ হাজার পাথর উত্তোলিত হয়। গড়ে প্রতিদিন পাথর বিক্রি হয়েছে আড়াই হাজার টনের মতো। সব মিলিয়ে উত্তোলিত পাথরের অর্ধেক থেকে এক-তৃতীয়াংশই অবিক্রীত রয়েছে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও সেবা) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে খনির ইর্য়াডে মজুত পাথর ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টন। এরমধ্যে ৪০ থেকে ৬০ মিমি আকারের ব্লাষ্ট ৯ লাখ টন, ৮০/১২০ বোল্ডার ৩ লাখ ৬৭ হাজার টন। বর্তমানে খনিতে ৬ সাইজের পাথর উৎপাদন হচ্ছে। সেই সঙ্গে দেশের মেগা প্রকল্পসহ অনেক নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় পাথর বিক্রি কমেছে। মধ্যপাড়ার পাথর ক্রয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিডিউলে মধ্যপাড়া পাথর ক্রয়ের নির্দেশাবলী ও মুল্য সংযুক্তি রয়েছে। বাকিতে বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল রেল ১ লাখ ৩০ হাজার টন পাথর গ্রহন করেছে।
খনির ডিলার মেসার্স মমিন এন্টারপ্রাইজ মালিক মো: মমিনুল হক বলেন, আমদানি করা পাথর (কালো) তার চেয়ে মধ্যপাড়ার পাথর কয়েকগুণ ভাল। ২০০ টাকা কমে মধ্যপাড়া খনির পাথর পাওয়া যাচ্ছে। আগে ৩ শতাংশ কমিশন দেওয়া হতো এখন তা বন্ধ আছে। শুধুমাত্র ভ্যাট ও আয়কর কাটছে ১৫ শতাংশ। এখন ডিলারদের চাহিদা সাইজ অনুযায়ী পাথর পাওয়া যাচ্ছে। মধ্যপাড়ার পাথরের মান ভালো এবং ওজন বেশি।
বৃহস্পতিবার দুপরে মধ্যপাড়া গ্রাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (এমজিএমসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী ডিএম জোবায়েদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে, নদী শাসন কাজে পাথর ক্রয় না করায় ইয়ার্ড পূর্ণ এবং বিদেশ থেকে নিয়ে আসা ডেটোনেটরের (বিস্ফোরক) উপর রয়্যালটি না কমানোয় পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা। বাংলাদেশ রেলওয়ে, নদী শাসন কাজসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজে যদি খনির পাথর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। তাহলে দেশের একমাত্র খনিটি প্রাণ ফিরে পাবে। সরকারের হবে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব আয়। পাথর পরিবহনে মধ্যপাড়া খনি থেকে পার্বতীপুরের ভবানীপুর ষ্টেশন পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার রেলপথটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। এটি সংস্কার করে চালু করলে পাথর পরিবহন খরচ অনেক কমে আসবে।