


২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল মঙ্গলবার সকাল ৮টায় সাভারে রানা প্লাজা ধসের তিন দিন পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছিলেন নাসিমা বেগম (৪০)। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সেই নাসিমা এবার হার মানলেন রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের মর্মান্তিক বাস দুর্ঘটনায়। জীবিকার তাগিদে ঢাকার পথে যাত্রাই তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ালো। নিহত নাসিমা বেগম পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের মধ্য আটরাই গ্রামের মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী। গত ২৫ মার্চ বিকালে ভাগনির শ্বশুরবাড়ি ফরিদপুর থেকে বাসযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন তারা। বাসে নাসিমার সঙ্গে ছিলেন তার ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আজমিরা খাতুন, ৪ বছরের শিশু সন্তান আব্দুর রহমান এবং আজমিরার স্বামী আব্দুল আজিজ। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসটি দুর্ঘটনার কবলে পড়লে আব্দুল আজিজ ভাগ্যক্রমে প্রাণে বাঁচলেও নিখোঁজ হন বাকি তিনজন। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টায় নাসিমা, ভাগ্নি অন্তঃসত্ত্বা আজমিরা (৩০) ও ভাগনে আব্দুর রহমান (৬) মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাতে অ্যাম্বুলেন্স যোগে মরদেহ নিয়ে পার্বতীপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন স্বজনরা। কিন্তু নিয়তির খেলা যেন তখনও শেষ হয়নি। রাত ৯টার দিকে কুষ্টিয়া পার হওয়ার সময় হঠাৎ চলন্ত অ্যাম্বুলেন্সের চাকা ফেটে (ব্লাস্ট) গিয়ে ফের দুর্ঘটনার মুখে পড়ে লাশবাহী গাড়িটি। শুক্রবার (২৭ মার্চ) ভোররাতে তার লাশবাহী গাড়িটি বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার বাতাস। উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের মধ্যআটরাই গ্রামে তার বাবার বাড়িতে সকাল ১০ টার দিকে জনাজা ও দাফন কাজ সম্পন্ন হয় নাসিমার। ওই বাসডুবির ঘটনায় লাশ হয়ে ফেরেন তার ভাগ্নি অন্তঃসত্ত্বা নাজমিরা (৩০) ও ভাগনে আব্দুর রহমান (৬)। নাসিমার বড়ো বোন সানোয়ারা কাল্টি জানান, তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নাসিমা সবার ছোট। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি চাকরির সন্ধানে সাভারে ভাগনি আজমিরা খাতুনের বাসায় যান নাসিমা। দীর্ঘ এক মাস চেষ্টার পরও চাকরি না হওয়ায় গত ২৫ মার্চ বিকালে ভাগনির শ্বশুরবাড়ি ফরিদপুর থেকে বাসযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন তারা।
বাসে নাসিমার সঙ্গে ছিলেন তার ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ভাগনি আজমিরা খাতুন, ৪ বছরের শিশু সন্তান আব্দুর রহমান এবং আজমিরার স্বামী আব্দুল আজিজ। এক যুগ আগে একই উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে নুর ইসলামের সাথে বিয়ে হয় তার। স্বামীর মৃত্যুর পর মৃত বাবা আব্দুল সাত্তার এর বাড়ীতে বসবাস করতো নাসিমা। গেল রমজানে চাকুরির খোঁজে ভাগ্নী নাজমিরার বাড়ি রাজবাড়ীর কালুখালীতে চলে যায়। সেখানে ঈদ শেষে ভাগ্নী জামাই আব্দুল আজিজ ঢাকায় চাকুরি করার সুবাদে নাসিমা ও তাজমিরার ছেলে কিশোর আব্দুর রহমানকে (৬) নিয়ে সৌহার্দ্য পরিবহনে স্ব-পরিবারে কর্মস্থলে ফিরছিলো তারা। ঢাকায় ভাড়া বাসায় ফিরে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে চাকরির চেষ্টা করবে নাসিমা। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান নাসিমাসহ তার ভাগ্নী ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা তাজমিরা ও ৬ বছরের কিশোর ভাগ্নে আব্দুর রহমান। দুর্ঘটনার আগে ভাগ্নী জামাই আব্দুল আজিজ নামাজের জন্য বাস থেকে নেমে পড়ায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এব্যাপারে উপজেলার ৮নম্বর মধ্য আটরাই গ্রামের ইউপি সদস্য শাহ নেওয়াজ বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর বাবার বাড়ীতে ১৩ বছরের এক ছেলে কে নিয়ে চরম সংকটে ছিলেন নাসিমা। রানা প্লাজায় কাজ করার সময় ভবন ধসে পড়লে তিনি তিন দিন আটকে থাকার পর উদ্ধার পেয়েছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর বাবার বাড়িতে বসবাস করতো। স্বামীর মৃত্যুর পর শত কষ্টের মধ্যে ছেলের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে চাকরি খুঁজছেন। দরিদ্র পরিবারটি রেখে যাওয়া ছেলেটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় মধ্যে পড়েছে। পার্বতীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাদ্দাম হোসেন জানান, খবর পেয়ে নিহতের বাড়িতে যান এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শোকাহত পরিবারকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে ২৫ হাজার টাকা প্রদান করেন। তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছে।