


গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে নিজের ছেলে ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির ভাগিনাকে নিয়োগ দিতে জালিয়াতির মহোৎসবে মেতে উঠার অভিযোগ উঠেছে সুপার মো শহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে। তিনি উপজেলার বজরা কঞ্চিবাড়ী বজরা মজিদিয়া দাখিল মাদ্রাসা সুপার। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবরে ম্যানেজিং কমিটি নির্বাচনের নিমিত্তে প্রিজাইডিং অফিসার মনোনয়ন চেয়ে ওই মাদ্রাসার সুপার মো. শহিদুর রহমান গত বছরের ১৮ আগস্ট আবেদন করেন। স্মারক নং বঃকঃমঃদাঃমাঃ/২০২৫/২৩। এরপর তৎকালীন ইউএনও রাজ কুমার বিশ্বাস ওই তারিখে উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. বেলাল হোসেনকে প্রিজাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। স্মারক নং ০৫.৫৫.৩২৯১.০২২.০২.০১২.১৭.৮০২। পরে প্রিজাইডিং অফিসার মো. বেলাল হোসেন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করেন ওই বছরের ৭ অক্টোবর। তফসিলে ৯, ১২ ও ১৩ অক্টোবর/২৫ ছিলো মনোনয়ন পত্র গ্রহণ ও জমা দান। ১৪ অক্টোবর/২৫ ছিলো মনোনয়নপত্র বাছাই ও বৈধ প্রার্থীর তালিকা প্রকাশ। আপিল গ্রহণ ও শুনানি ছিলো ১৫ অক্টোবর/২৫।
মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার ও চুড়ান্ত প্রার্থীর তালিকা প্রকাশের তারিখ ছিলো ১৬ অক্টোবর/২৫। নির্বাচন হওয়ার কথা ছিলো ২৭ অক্টোবর/২৫। তথ্যে জানা যায়, ওই মাদ্রাসায় ম্যানেজিং কমিটি গঠনের জন্য প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ দেন ইউএনও। পরে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্বে নিয়োজিত উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার তফসিল ঘোষণা করেন। এরপরে সুপার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন ও জমা দেন। কমিটি গঠনে এরপর আর কোনো পদক্ষেপ নেননি সুপার। সে কারণে কমিটি করা সম্ভব হয়নি। অথচ ওই সুপার ম্যানেজিং কমিটি গঠন দেখিয়ে ৫ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। এ বছরের গত ১৯ ফেব্রুয়ারী জাতীয় দৈনিক নয়া দিগন্ত ও স্থানীয় দৈনিক মাধুকর পত্রিকায় এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। ৫ পদের মধ্যে ঈদের আগের দিন গত ২০ মার্চ দুই পদে নিয়োগ দেয়া হয়। সুপারের ছেলেকে দেয়া হয় অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে ও সভাপতির ভাগিনাকে দেয়া হয় পরিচ্ছন্নতা কর্মী পদে। বাকি ৩ পদ ইবতেদায়ী প্রধান শিক্ষক, ল্যাব সহকারী ও অফিস সহায়ক পদেও নিয়োগ দেয়ার পাঁয়তারাও চলছে। এদিকে সুপার হয়ে নিজের ছেলেকে নিয়োগ দিতে আইনী জটিলতা থাকায় মাদ্রাসার সহকারী সুপার মো. গোলজার হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত সুপারের দায়িত্ব দিয়ে এ নিয়োগ দুটি পার করা হয়।
নিয়োগ কমিটির ৫ সদস্যের মধ্যে ডিজির প্রতিনিধি ছাড়া বাকি সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। বিষয়গুলো জানাজানি হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দূর্নীতিবাজ সুপার এবং সভাপতির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিও জানান।
এ বিষয়ে কথা হয় নিয়োগ কমিটির সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধি সুমন্ত চন্দ্র বর্মণের সাথে। তিনি বলেন, “আমিও শুনেছি নিয়োগ কমিটির সদস্য করা হয়েছে আমাকে। এর বেশি কিছু জানি না। তবে তিনি এ ঝামেলায় নিজেকে জড়াতে চাচ্ছেন না। কারণ একে তিনি হিন্দু মানুষ আবার প্রতিষ্ঠান থেকে তার বাড়িও বহুদূর।” কথা হয় আরেক নিয়োগ কমিটির সদস্য ও শিক্ষক প্রতিনিধি মো. সাজ্জাদুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, বিধি মোতাবেক যে সিস্টেমে কমিটি গঠন হওয়ার কথা সে সিস্টেমে করা হয়নি। হলে আমরা জানতাম। কারণ আমরা নিয়মিত মাদ্রাসায় আসি।
তবে লোকমুখে শুনে আসতেছি সুপার হুজুর গোপনে নাকি কমিটি গঠন করেছেন এবং নিয়োগও দিয়েছেন। আমারা বলেছি এ কমিটি আমরা মানি না এবং মানবোও না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ কমিটিতে আমাকে শিক্ষক প্রতিনিধি করা হয়েছে কিন্তু আমি জানি না। বিষয়টি তারা আমাকে জানিয়েছেন। নিয়োগ পরীক্ষা কবে হয়েছে, কোথায় হয়েছে বা হয়েছে কি না কিছুই আমি জানি না। তবে এনটিআরসি এর একজন নতুন শিক্ষকের বিল করার কথা বলে আমার কাছে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। নিয়োগের বিষয়ে কোনো স্বাক্ষর দেইনি। মাদ্রাসার সহকারী সুপার মাওলানা মো. গোলজার হোসেন বলেন, আমার জানামতে এ প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হয়নি। তাছাড়াও বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি ম্যানেজিং কমিটি গঠনের কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার ও উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মো. বেলাল হোসেন স্যারের মাধ্যমে। তিনিও বলেছেন কমিটি গঠন করা হয়নি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিয়োগ কমিটিতে আমাকে নাকি ভারপ্রাপ্ত সুপার দেখানো হয়েছে। সুপার হুজুর তার নিজের ছেলেকে নিয়োগ দিতেই নাকি এ জাল জালিয়াতি করেছেন। কারণ সুপার হয়ে তিনি নিজের ছেলেকে নিয়োগ দিতে আইনী জটিলতা রয়েছে।
এ বিষয়ে কথা হয় মাদ্রাসার সুপার মো. শহিদুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, কমিটি হয়েছে। তবে নিয়োগ দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে ব্যাস্ততা দেখিয়ে ফোন কেটে দেন। এরপরে আবারও ফোন দেয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।
অভিযুক্ত ভুয়া কমিটির সভাপতি ও ধর্মপুর আবদুল জব্বার ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মো. ইব্রাহিম আলী সরকারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ওই মাদ্রাসায় ম্যানেজিং কমিটি গঠনে নিয়োজিত প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ও উপজেলা একাডেমি সুপারভাইজার মো. বেলাল হোসেন বলেন, “প্রিজাইডিং অফিসার পদে নিয়োগ পেয়ে গত বছরের ৭ অক্টোবর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা দেই। পরে সুপার মনোনয়নপত্র জমা দেন মাত্র। ম্যানেজিং কমিটি গঠনের বাকি ধাপগুলো সুপার আর করেননি। সে কারণে ওই মাদ্রাসায় ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি।” তিনি আরও বলেন, “শুনতেছি ওই মাদ্রাসার সুপার নাকি ভুয়া কমিটি বানিয়ে নিয়োগও দিয়েছেন।”
এ বিষয়ে কথা হয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়োগ কমিটির সদস্য ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের অতিরিক্ত দায়িত্বে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, “ঈদের আগে দিন ডিজির প্রতিনিধি এ বিষয়ে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে থাকায় আসতে পারিনি। কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলে নিয়োগ দিতে বলেছি। এখন শুনতেছি ওই মাদ্রাসায় কমিটিও নাকি হয়নি। এটা প্রমাণিত হলে নিয়োগও টিকবে না। বিষয়টি তদন্তে সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাসও তিনি।”
এ বিষয়ে কথা হয় বজরা কঞ্চিবাড়ী মজিদিয়া দাখিল মাদ্রাসার নিয়োগ বোর্ডের মাদ্রাসা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (ডিজি) প্রতিনিধি মো. জাহাঙ্গীর আলম চাকলাদারের সাথে। তিনি বলেন, “ঈদের আগেরদিন ওই মাদ্রাসায় অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ও পরিচ্ছন্ন কর্মী পদে মোট দু’জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।” এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ওই মাদ্রাসার কমিটি কি ভাবে হয়েছে বিষয়টি আমাদের জানার কথা নয়। তবে অবৈধভাবে কমিটি হয়ে থাকলে মাদ্রাসা অধিদপ্তরে অভিযোগ দিলে কমিটি বাতিল হয়ে যাবে।”