


এ যেন ‘মিনি কক্সবাজার’। চারদিকে অথৈ জল, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে সরু আঁকাবাঁকা একটি পাকা সড়ক। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি কিছু গাছ, জলে ভাসছে সাদা শাপলা আর গোলাপি পদ্ম। ছোট ছোট নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে বিলের বুকে। বিকেলের নরম আলো পানির ঢেউয়ে পড়ে তৈরি করছে ঝিলমিল এক আবহ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, যেন প্রকৃতি নিজের হাতে এঁকেছে এক জীবন্ত ক্যানভাস। এ দৃশ্য গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের তেনাছিড়া বিলের। এটি সাঘাটা উপজেলার সব বড় বিল বলে পরিচিত। সরেজমিনের দেখা যায়, গতকাল শুক্রবার জুমার পর থেকেই লোকজনের অনগনা বাড়ছে। কেউ বাইকে এসেছেন কেউ বা অন্য পরিবহনে ।
সবার লক্ষ্য একটাই পাকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে চোখ যতদূর যায় তাকিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা আর মনের মতো ছবি তোলা। একই চিত্র প্রতি সাঘাটা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র শিখর মাহমুদ জানান,“বন্ধুদের সাথে আসছি ছবি তোলার জন্য । আমরা স্টুডেন্ট তাই কক্সবাজার যাওয়ার টাকা জোগাড় করা আমাদের জন্য কষ্টকর । এজন্য আমরা আসছি সাঘাটা তেনাছিড়া বিলে ছবি তুলে আনন্দ উপভোগ করতে। এটাই আমাদের কক্সবাজার ।
মিম আক্তার নামের এক কলেজ ছাত্রী জানান, পরিবার সহ আমরা আসছি এই বিলে ঘুরতে। এখানে এসে অনেক ভালো লাগছে। বিনা টাকার অনন্দ পাওয়ার মতো এমন পরিবেশ জেলার কোথাও নেই। জানা যায়, গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার ঘুড়িদহ ইউনিয়নের তেনাছিড়া বিলের। এটি সাঘাটা উপজেলার সব বড়ো বিল বলে পরিচিত। বর্ষা এলেই পানিতে ভরে ওঠে বিস্তীর্ণ এই বিল। তখন এলজিইডির নির্মাণাধীন সড়কটি পানির মাঝখানে এক নান্দনিক সৌন্দর্য তৈরি করে। দুই পাশের সবুজ গাছপালা, শীতল বাতাস, ঢেউ খেলানো জলরাশি আর সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য একসঙ্গে মিলে জায়গাটিকে দিয়েছে ভিন্ন এক পরিচয়। স্থানীয়রা এখন ভালোবেসে বিলের এই জায়গাটির নাম দিয়েছেন ‘মিনি কক্সবাজার’ ।
প্রতিদিন বিকেল হলেই সাঘাটা, গাইবান্ধা, বগুড়া, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসছেন এখানে। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে, কেউ আবার শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য ক্যামেরাবন্দি করতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও আলোকচিত্রীদের উপস্থিতিও দিন দিন বাড়ছে।
শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, শাপলা-পদ্মে ভরা বিল আর ছোট ছোট ডিঙি নৌকার দৃশ্য দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। অনেকেই নৌকায় ভেসে বিল ঘুরে দেখছেন, আবার কেউ হাঁটুসমান পানিতে নেমে গোসল করে উপভোগ করছেন বর্ষার নির্মল পরিবেশ। শিশুদের হাসি, পানির কলকল শব্দ আর পাখির ডাক মিলিয়ে পুরো এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক প্রশান্তিময় আবহ। পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী রেজা মিয়া বলেন, পরিবার নিয়ে এখানে এসে খুব ভালো লাগছে। বিলের মাঝ নিয়ে রাস্তায় পানি উঠার ফলে বিলের প্রকৃতির সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।
এমন পরিবেশে কিছুক্ষণ থাকলেই মন ভালো হয়ে যায়।
কামরুল ইসলাম নামের এক স্থানীয় যুবক জানান, প্রতিদিন বিকালে শত শত মানুষ আসে এখানে। মানুষ একটু আনন্দ পাওয়ার জন্য কতদূর থেকে আস সেটা এখানে না আসলে বুঝানো যাবে না। কলেজ শিক্ষক মাইদুল ইসলাম জানান, “গাইবান্ধার সাঘাটায় এই কক্সবাজার দেখতে আসছি। এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুব কম জায়গায় দেখা যায়। যদি এই জায়গাটি সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটনকেন্দ্র হতে পারে ।”
বগুড়া থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সাংবাদিক ও লেখক প্রতীক ওমর বলেন, তেনাছিড়া বিল শুধু একটি বিল নয়, এটি গ্রামবাংলার প্রকৃত সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। সূর্যাস্তে মুহূর্ত যে কাউকে মুগ্ধ করবে। সাঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এ বছর টানা বৃষ্টিপাতের কারণে তেনাছিড়া বিলে পর্যাপ্ত পানি জমেছে। একটি রাস্তার কিছু অংশ তলে গিয়েছে, ফলে বিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আগের তুলনায় অনেক বেশি ফুটে উঠেছে।