


টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া,পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড় থেকে উত্তরের জনপদ। দুই চাকার সঙ্গী সাইকেল নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চষে বেড়িয়েছেন তরুণ সাইক্লিস্ট মোহাম্মদ খাইরুল। তার একটাই ইচ্ছে তরুনদের মানুষকে নিয়ে পরিবেশ বান্ধব সমাজ গঠনে , নারী ও শিশু শিক্ষা বৃদ্ধি এবং শিশু শ্রম বন্ধের ভবিষৎ চিন্তা ভাবনা কেমন। ২০২২ সালে সাইকেলে দেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করে আলোচনায় আসা এই তরুণ এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষ্যে ঘোষণা দিয়েছেন আরও বড় এক অভিযানের।
তার নতুন লক্ষ্য এবার দেশের ৫০০ উপজেলা ভ্রমণ করবেন সাইকেলে। তার এই রাইট শেয়ারকে এলাকাবাসী দেখে হতভাম্ব। তার এই পথচলাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। সাইক্লিস্ট খায়রুল বলেন, ঝড়-বৃষ্টি, ক্লান্তি কিংবা দীর্ঘ পথ কোনো বাধাই থামাতে পারে না সাইক্লিস্ট খায়রুলকে। সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে স্বপ্নের পিছে ছুটে চলা এই তরুণ যেন প্রমাণ করে চলেছেন- ইচ্ছাশক্তি আর সাহস থাকলে সীমিত সামর্থ্যও বড় কোনো স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। প্রচন্ড তাপদাহে পুরো শরীর ঘেমে একাকার। তৃষ্ণায় শুকিয়ে গেছে মুখ।
মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য, দীর্ঘ পথের ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তা সবকিছুকে সঙ্গী করেই এগিয়ে চলছেন এই তরুণ। কাঁধে দেশকে জানার, মানুষের গল্প শোনার এবং বাংলাদেশের সৌন্দর্যকে কাছ থেকে দেখার অদম্য ইচ্ছা থেকেই শুরু হয়েছে খায়রুলের এই ব্যতিক্রমী যাত্রা। একটি । ব্যাগ, মাথার নিরাপত্তা হেলমেট, সঙ্গে একটি সাইকেল, বাংলাদেশের পতাকা আর বুকভরা স্বপ্ন। দুই চাকার বাহনে ভর করে তিনি ছুটে চলেছেন এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায়। লক্ষ্য ধীরে ধীরে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে দেখা।তার বাড়িময়মনসিংহের মুক্তাগাছা গ্রামে। মুক্তাগাছার পরিচিত মুখ এবং স্থানীয় সাইক্লিং সংগঠন ‘মুক্তাগাছা সাইক্লিস্টস’-এর সদস্য খাইরুল মনে করেন দেশের প্রকৃতসৌন্দর্য শুধু বড় শহর কিংবা পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দেশের প্রতন্তঅঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, আঞ্চলিক খাবার এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অজানা ভান্ডার। ৬৪ জেলা ভ্রমণ ছিল স্বপ্নপূরণের প্রথম ধাপ।
সেই যাত্রায় দেশের মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। এবার আরও গভীরে যেতে চান তিনি। উপজেলা পর্যায়ে গিয়ে সেখানকার ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী খাবার, দর্শনীয় স্থান, সংস্কৃতি এবং মানুষের জীবন সংগ্রামের গল্প তুলে ধরতে চান। অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে যেগুলো এখনও জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়নি।সাইক্লিং জগতে বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে খাইরুলের। ২০২২ সালে দেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণের পর ২০২৩ সালে টানা ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে সহনশীলতা ও মানসিক দৃঢ়তার অনন্য নজির গড়েন তিনি। ২০২৪ সালে দেশের সর্বউত্তরের তেঁতুলিয়া থেকে সর্বদক্ষিণের টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ সাইকেল রাইড সম্পন্ন করেন।
এছাড়া ‘জমিদারের শহর’ হিসেবে পরিচিত মুক্তাগাছা থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত দূরপাল্লার সাইকেল যাত্রাসহ আরও বেশ কয়েকটি অভিযানে অংশ নিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ঘোষিত ৫০০ উপজেলা অভিযানকে তিনি শুধু ভ্রমণ হিসেবে দেখছেন না। এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন পরিবেশ সংরক্ষণ, প্লাস্টিক দূষণ রোধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারার বার্তা। খাইরুল বলেন, বর্তমানে প্লাস্টিক দূষণ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে চাই। বিশেষ করে তরুণদের বলতে চাই, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, আমাদের সবার। সাইকেল একটি পরিবেশবান্ধব বাহন। এটি দূষণ কমায়, স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও গভীর করে। তিনি আরও বলেন, আমি সবসময় বিশ্বাস করি, পরিবর্তনের শুরু হতে পারে একজন মানুষ থেকেই। যদি কয়েকজন তরুণও আমার এই বার্তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়, তাহলে সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।
নিয়মিত সাইক্লিং কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি তরুণদের মাদক ও মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে রেখে সুস্থ ও ইতিবাচক জীবনধারার প্রতি উৎসাহিত করে আসছেন । সাইকেল চালিয়ে সারাদেশ (বাংলাদেশ) পাড়ি দেওয়া একটি দারুণ রোমাঞ্চকর ও সাহসিকতাপূর্ণ কাজ। কয়েকজন এলাকাবাসী বলছেন, সে শুধু নিজের শখ পূরণের জন্য ঘুরছে না, পাশাপাশি মানুষকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে সচেতন করারও চেষ্টা করছে। গাছ লাগানো, প্রকৃতি সংরক্ষণ করা এবং পরিবেশ বাঁচানোর যে বার্তা সে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পথ চলতে তার মতো তরুণদের আরও সহযোগিতা করা উচিত। আমরা মনে করি, দেশের তরুণ সমাজ যদি তার মতো ইতিবাচক চিন্তা ও উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে সমাজ ও দেশের অনেক উপকার হবে। আমরা তার এই যাত্রার সফলতা কামনা করি এবং আশা করি সে নিরাপদে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।