


বলা হয়, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। সেই মেরুদণ্ড যদি দুর্বল, ভঙ্গুর ও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তাহলে একটি জাতির ভবিষ্যৎ কতটা অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে—তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রংপুরের পীরগঞ্জে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিক চিত্র দেখে এমন আশঙ্কাই এখন জোরালো হচ্ছে। এ অবস্থাকে নিছক ফলাফল খারাপ বলা যাবে না; বরং পুরো ব্যবস্থার গভীরে যে অসংগতি বাসা বেঁধেছে, তারই বহিঃপ্রকাশ এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল।
সদ্য প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পীরগঞ্জের বেশ কয়েকটি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। কোনো কোনো বিদ্যালয় থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করেনি। আবার কোনো বিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র একজন এবং সেই একজন পাস করায় বিদ্যালয়ের পাসের হার শতভাগ! পরিসংখ্যানের বিচারে এটি হয়তো শতভাগ সাফল্য, কিন্তু শিক্ষার সামগ্রিক মান বিচারে এটি কি আদৌ সাফল্যের প্রতিচ্ছবি?
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, উপজেলার কুমারপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ৯ জন ও মানবিক বিভাগে ৯ জনসহ মোট ১৮ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ঘাষিপুর উচ্চ বিদ্যালয়েও পরীক্ষার্থী ছিল ১৮ জন। কিন্তু এ দুই প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ঘাষিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষার শুরুতেই অনুপস্থিত থাকায় ফলাফলের চিত্র আরও করুণ হয়েছে।
অন্যদিকে গুর্জিপাড়া বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাত্র একজন ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। ফলে বিদ্যালয়টির পাসের হার শতভাগ। এর আগেও একই ধরনের ফলাফল দেখা গেছে বলে জানা যায়। প্রশ্ন হলো—একটি বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর পরীক্ষার্থী কেন এত কম? সেখানে শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থী ভর্তি, পাঠদান ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কার্যকারিতা নিয়ে কি যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছে?
সাতগড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন। ছোট উজিরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ১১ জনের মধ্যে একজন। সরলিয়া বেতকাপা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯ জনের মধ্যে দুইজন, রায়পুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ১৪ জনের মধ্যে তিনজন, গিলাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২২ জনের মধ্যে চারজন এবং হরিন শিং উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৭ জনের মধ্যে চারজন উত্তীর্ণ হয়েছে। হরিন শিং উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এ ছাড়া শ্যামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৮ জনের মধ্যে পাঁচজন, কাউয়া পুকুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৪ জনের মধ্যে পাঁচজন, বড় আলমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৩ জনের মধ্যে ছয়জন, হলদিবাড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে আটজনের মধ্যে ছয়জন, ঝাড় আমবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে ২০ জনের মধ্যে সাতজন, হাতীবান্ধা উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৬ জনের মধ্যে সাতজন এবং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় চৈত্রকোলে ২৫ জনের মধ্যে মাত্র আটজন শিক্ষার্থী পাস করেছে।
উল্লিখিত ১৭টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২৫৫ জন। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৬৫ জন। অর্থাৎ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পরীক্ষার্থীই কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পারেনি। এ পরিসংখ্যান পীরগঞ্জের মাধ্যমিক শিক্ষার বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবার দাবি রাখে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে। যেমন, ছোট উজিরপুর ও সাতগড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়—দুই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৩৫ জনের বেশি বলে জানা গেছে। হলদিবাড়ী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র আটজন, অথচ শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ১৬ জন। প্রশ্ন উঠতেই পারে—এত শিক্ষক-কর্মচারী থাকার পরও শিক্ষার্থীদের ফলাফল এমন বিপর্যস্ত কেন? এখানেই মূল সমস্যাটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন। শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করে কিংবা ‘ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা করে না’—এমন সহজ ব্যাখ্যা দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষক, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, পাঠদান পদ্ধতি, জবাবদিহি, অভিভাবকের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক তদারকির সম্মিলিত কার্যকারিতার ওপর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠানে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের যোগসাজশে মেধাবীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও ডিজির প্রতিনিধির মতো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু অনিয়ম নয়, শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি এক বিদ্যালয় থেকে অন্য বিদ্যালয়ের নির্ধারিত দূরত্ব, শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষক প্রয়োজনীয়তা এবং বাস্তব শিক্ষার্থী উপস্থিতির বিষয়গুলোও নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীসংখ্যা দেখিয়ে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার প্রবণতা থাকলে সেটি বন্ধ করতে হবে।
কারণ বাস্তবতা হলো—যে বিদ্যালয়ে বছরের পর বছর পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই, সেখানে শিক্ষক-কর্মচারী, অবকাঠামো ও সরকারি সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। অন্যদিকে শিক্ষার্থী আছে, অথচ শিক্ষার মান নেই—এমন প্রতিষ্ঠানও সমানভাবে উদ্বেগের কারণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মামলা, হামলা, দলাদলি ও নানা বিরোধের কেন্দ্র বানানো হলে সেখানে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবেই। একটি বিদ্যালয় রাজনৈতিক বা ব্যক্তিস্বার্থের সংঘাতের ক্ষেত্র হতে পারে না। বিদ্যালয় হবে জ্ঞানচর্চা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনের স্থান।
পীরগঞ্জের মাধ্যমিক শিক্ষার এই চিত্রকে তাই বিচ্ছিন্ন কয়েকটি বিদ্যালয়ের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি সামগ্রিক সংকেত। এখন প্রয়োজন গভীর অনুসন্ধান ও কঠোর আত্মসমালোচনা। কোন বিদ্যালয়ে কেন শিক্ষার্থী নেই, কোথায় শিক্ষক বেশি, কোথায় পাঠদান হচ্ছে না, কোথায় নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে, কোথায় ব্যবস্থাপনা দুর্বল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
প্রয়োজনে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক অডিট করা হোক। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ফলাফল, উপস্থিতি, নিয়োগ, ব্যবস্থাপনা কমিটি ও আর্থিক কার্যক্রম—সবকিছু যাচাই করা হোক। যেসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার নামে শুধু কাগজে টিকে আছে, সেগুলোর ব্যাপারেও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
শিক্ষা কোনো ব্যক্তির ব্যবসা নয়, কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারও নয়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান অবলম্বন। পীরগঞ্জের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা তাই শুধু হতাশার নয়, সতর্ক হওয়ারও সময়। রোগ যখন মেরুদণ্ডে, তখন সামান্য ওষুধে কাজ হবে না। প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রয়োজন কঠিন সিদ্ধান্ত, প্রয়োজন কার্যকর সংস্কার।
পীরগঞ্জের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ডকে সুস্থ করতে এখনই জরুরি ‘সার্জারি’ প্রয়োজন। বিলম্ব হলে ক্ষত আরও গভীর হবে।