


গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের মাওলানা ভাসানী সেতু এখন কেবলমাত্র যাতায়াতের পথ নয়। বরং এ সেতু এখন দর্শনার্থীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থানেও পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন টিকটকারসহ হাজার-হাজার মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়াতে আসছেন এখানে। যাতায়াতের সেতুটি এখন দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দেয়া রেলিং এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। সে কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সেতুতে আসা দর্শনার্থীরা। শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেতুর দুপাশে রয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ ফুট প্রস্থের পায়ে চলা পথ। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে দেয়া হয়েছে রেলিং।
আর এ রেলিং এ আছে দুই গাডারের ৬৪টি সংযোগ স্থল। সেগুলো বেশি ফাঁকা হওয়ায় যে কোনো বয়সের দর্শনার্থী নদীতে পড়ে যেতে পারে যে কোনো সময়। ফাঁকা স্থানগুলোর দূরত্ব ১৫ থেকে ১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত মেপে দেখা গেছে। দিনের বেলায় সেগুলো দেখা গেলেও রাতে বেলায় বোঝার উপায় থাকে না। এখনো সবগুলো বাতি জ্বলছে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে আরও বিদঘুটে অন্ধকার নেমে আসে সেতু জুড়ে। তখন মনে হয় সেতুর ৬৪টি সংযোগস্থলই যেনো এক-একটি মরণফাঁদ। এমনটাই বললেন সেতুতে আসা দর্শনার্থীরা।
বগুড়া থেকে সেতু দেখতে এসেছেন মো. আলমগীর হোসাইন। সঙ্গে স্ত্রী ও ২ ছেলে মেয়ে। আনন্দ করতে এসে হাত ছেড়ে দিতে পারছেন না ৫ বছর বয়সের মেয়ে আয়াতের। যদি কোনো কারণে ওই ফাঁকা জায়গা দিয়ে নদীতে পড়ে যায় তাহলে বলতেই আঁতকে ওঠেন তিনি। সে কারণে স্বামী স্ত্রী দু’জন ২ বাচ্চার হাত ধরে ঘুরছেন সেতু ধরে। নদীতে পড়ে মারা যাওয়ার ভয় কেবলমাত্র তার পরিবারের একার নয়। বরং ভাসানী সেতুতে আনন্দ করতে আসা হাজারো দর্শনার্থীর। কথা হয় আরেক দর্শনার্থী মোছা. নার্গিস বেগমের সাথে। তার বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীতে। তিনিও এসেছেন তার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে। এ বিষয়ে কথা হয় তার সাথে। তিনি বলেন, ‘আরও কয়েকবার এসেছি এ সেতুতে ঘুরতে। এখানে আসার কথা মনে হলেই এ ফাঁকা স্থানগুলোর কথা মনে হয়।
তখন গা শিউরে ওঠে। খুবই ভয় হয়। সে কারণে মণ খুলে আনন্দ করতে পারি না সেতুতে এসে।’ ২ মেয়ে জারা ও জুহির হাত ধরে মা শিরিন রেলিং ঘেঁষে হাঁটছিলেন। তার বাড়ি সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পৌরসভায়। এ বিষয়ে ক্ষোভ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রেলিং ধরে সবাই হাটে। বিশেষ করে ছোটো বাচ্চারা। আর সেই রেলিং এর মাঝেমধ্যে ফাঁয়কা জায়গা। বাচ্চাদের একা ছেড়ে দিতে পারি না। এরপরও সবসময় থাকতে হয় আতঙ্কে। দুর্ঘটনা এড়াতে ফাঁকা এ স্থানগুলো দ্রুত বন্ধ করার জোর দাবিও জানান এ দম্পতি।’
তবে সেতুতে আগত হাজারো দর্শনার্থীর নদীতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী তপন চন্দ্র চক্রবর্তী। অট্ট হাসি দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে আমি কোনো ঝুঁকি দেখছি না। কারণ আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন, সেটা আপনি দেখে চলবেন না?। তাছাড়া এটা কোনো খেলা বা আনন্দের জায়গা নয় বলেও মন্তব্য করেন এ প্রকৌশলী।
এ সেতুতে কতোটি এ ধরনের ফাঁকা স্থান আছে এবং ফাঁকা স্থানগুলোর দূরত্ব কতো ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে সে বিষয়েও কোনো ধারণা দিতে পারেননি তিনি।’ এ বিষয়ে কথা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও রাজ কুমার বিশ্বাসের সাথে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খুবেই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি।’
এ বিষয়ে কথা হয় জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরীর সাথে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খুবেই জরুরি। আমরাও এটি নিয়ে ভাবছি। সেতুর সৌন্দর্য ঠিক রাখতে গিয়ে দেরি হচ্ছে। তবে আর দেরি নয়। কারণ সৌন্দর্যের আগে মানুষের জীবন বলেও জানান এ কর্মকর্তা।’
উল্লেখ্য, এ সেতুর উদ্বোধন হয় এ বছরের গত ২০ আগস্ট। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এলজিইডির সর্ববৃহৎ সেতু। এতে ব্যয় ধরা ছিলো ৯২৫ কোটি টাকা। এ সেতুর দৈর্ঘ্য ৪৯০ মিটার ও প্রস্থ ৯ দশমিক ৬ মিটার। অর্থায়ন করেছে বাংলাদেশ সরকার (জিওবি), সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ওফিড)। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর-চিলমারী সংযোগ সড়কে তিস্তা নদীর উপর নির্মিত হয়েছে মাওলানা ভাসানী সেতুটি।