1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
আইভরি কোস্টে মানবপাচারের ফাঁদ, প্রাণ গেল সানোয়ারের | দৈনিক সকালের বাণী
শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ০৩:০৪ পূর্বাহ্ন

আইভরি কোস্টে মানবপাচারের ফাঁদ, প্রাণ গেল সানোয়ারের

পীরগাছা (রংপুর) প্রতিনিধি
  • আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬
  • ১৮ জন দেখেছেন

‘আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ আইভরি কোস্ট থেকে ফোনের ওপাশে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই পরিবারের কাছে আকুতি জানিয়েছিলেন রংপুরের পীরগাছার সানোয়ার হোসেন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল বিদেশে গিয়ে ভাগ্যের চাকা ঘুরাবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, চাকরির প্রলোভনে আইভরি কোস্টে নিয়ে গিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি। একই ঘটনায় প্রাণে বেঁচে দেশে ফিরেছেন আরেক ভুক্তভোগী জব্বার মিয়া। তাঁর অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্রের নির্যাতনে তাঁর চোখের সামনেই মারা যান সানোয়ার। এজাহার ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পীরগাছা উপজেলার পশুয়া টাঙ্গাইলপাড়া এলাকার আব্দুর রহমান মিয়া এবং তাঁর ছেলে জাইদুর রহমান ওরফে রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আইভরি কোস্টে লোক পাঠানোর কথা বলে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তারা দাবি করতেন, তাদের মাধ্যমে অনেকেই বিদেশে গিয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাদের এমন আশ্বাসে বিশ্বাস করে কাউনিয়া উপজেলার গোড়াই গ্রামের জব্বার মিয়া এবং পীরগাছা উপজেলার পশুয়া খাঁপাড়া গ্রামের সানোয়ার হোসেন বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জনপ্রতি সাত লাখ টাকা চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আসামিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রহমান ট্রেডার্সে মোট ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়।

ভ্যানচালকের স্বপ্নভঙ্গ:
সানোয়ার হোসেন প্রায় ১০ বছর ধরে ভ্যান চালিয়ে এবং ছোট পরিসরে ভাঙারির ব্যবসা করে সংসার চালাতেন। পরিবারে স্ত্রী, ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে জুনাইদ (১২) ও বিবাহিত মেয়ে আফরিন (১৮) রয়েছেন। স্বজনদের দাবি, সংসারের অভাব-অনটন দূর করে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়েই তিনি বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বিদেশ যাওয়ার আগে স্বজনদের কাছে তিনি বলেছিলেন, কয়েক বছর কষ্ট করলে পরিবারের অবস্থা বদলে যাবে। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়।
বিমানবন্দর থেকে বন্দিশালায়:

চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশ থেকে রওনা হয়ে পরদিন আইভরি কোস্টে পৌঁছান সানোয়ার ও জব্বার। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর চাকরি নয়, অপেক্ষা করছিল ভিন্ন এক বাস্তবতা। অভিযোগ রয়েছে, কুমিল্লা অঞ্চলের ‘রাজু’ নামে এক দালাল বিমানবন্দর থেকে তাদের গ্রহণ করে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে একটি পরিত্যক্ত বাড়ির অন্ধকার কক্ষে তাদের আটকে রাখা হয়। ওই বাড়িতে আগে থেকেই কয়েকজন বাংলাদেশি দালাল অবস্থান করছিল।
ভুক্তভোগীদের কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। বরং শুরু হয় জিম্মি করে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে থাকা স্বজনদের কাছে ফোন করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
১৪ লাখ টাকার পর আরও ৮ লাখ:

পরিবারের সদস্যরা জানান, সানোয়ার ও জব্বারকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন স্বজনরা। নিরুপায় হয়ে সানোয়ারের বড় ভাই মনু মিয়া এবং পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন বিকাশ নম্বর ও ব্যাংক হিসাবে আরও আট লাখ টাকা পাঠান।
স্বজনদের আশা ছিল, টাকা পাঠানোর পর হয়তো তাদের মুক্তি মিলবে কিংবা কাজের ব্যবস্থা হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টি করা হলে গত ১৬ এপ্রিল মূল অভিযুক্ত আব্দুর রহমান মিয়া নন-জুডিশিয়াল ¯ট্যাম্পে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি অঙ্গীকারনামা সম্পাদন করেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সেটি ছিল সময়ক্ষেপণের কৌশল।

‘আমাকে বাঁচাও’ :

“আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে”
মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আইভরি কোস্ট থেকে পরিবারের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলেন সানোয়ার। সেই ফোনকল এখনও দুঃস্বপ্ন হয়ে তাড়া করে বেড়ায় স্বজনদের।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ফোনের ওপাশ থেকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সানোয়ার বলেছিলেন, ‘আমাকে বাঁচাও, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ এরপর ধীরে ধীরে যোগাযোগ কমে যায়। কিছুদিন পর আসে মৃত্যুর খবর।
নির্যাতনে মৃত্যু, দেশে ফিরলেন জব্বার:
অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একপর্যায়ে গত ২২ মে আইভরি কোস্টে মারা যান সানোয়ার হোসেন।
একই ঘটনায় প্রাণে বেঁচে ফেরা জব্বার মিয়া গত ৫ জুন দেশে ফেরেন। দেশে ফিরেই গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি।
চিকিৎসা শেষে থানায় দেওয়া অভিযোগে জব্বার মিয়া দাবি করেন, আইভরি কোস্টে তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে এবং তাঁর চোখের সামনেই সানোয়ার মারা গেছেন।
জব্বার মিয়া বলেন, ‘তারা আমাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে আইভরি কোস্টে পাচার করেছে। সেখানে আটকে রেখে নির্যাতন করেছে। আমার চোখের সামনে সানোয়ার মারা গেছে। আমি জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
মরদেহের অপেক্ষায় পরিবার:

সানোয়ারের মৃত্যুর প্রায় ২২ দিন পার হলেও এখনও দেশে ফেরেনি তাঁর মরদেহ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মরদেহ এখনও আইভরি কোস্টেই রয়েছে। মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই। দূতাবাসের সঙ্গেও কার্যকর যোগাযোগ করতে পারেননি তারা।
স্বামীকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন হাজেরা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাত। ভালো থাকার আশায় বিদেশে গিয়েছিল। এখন আমি শুধু আমার স্বামীর লাশটা দেশে ফেরত চাই। যারা আমার স্বামীর সর্বনাশ করেছে, তাদের বিচার চাই।’
বাবার জন্য অপেক্ষা:

বাবার মৃত্যুর বিষয়টি এখনও মেনে নিতে পারছে না ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে জুনাইদ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলে, ‘আমার বাবাকে মেরে ফেলেছে। আমি শুধু একবার বাবার মুখটা দেখতে চাই।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতিদিনই বাবার কথা জানতে চায় সে। বিদেশে থাকা বাবার মরদেহ দেশে ফিরবে, সেই আশাতেই দিন গুনছে পুরো পরিবার।
পীরগাছার পশুয়া খাঁপাড়ার ছোট্ট বাড়িটিতে এখন প্রতিদিন অপেক্ষা শুধু একটি মরদেহের। বিদেশে ভাগ্য বদলাতে যাওয়া সানোয়ার আর কোনোদিন জীবিত ফিরবেন না। তবে তাঁর স্ত্রী-সন্তান এখনও অপেক্ষা করছেন শেষবারের মতো তাঁকে দেখার জন্য। একই সঙ্গে তাদের দাবি, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
গত ৮ জুন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ভুক্তভোগীদের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ব্যবসায়ী সবুজ মিয়া বলেন, আব্দুর রহমান ও তার ছেলে রিয়াদ মানবপাচার চক্রের সাথে জড়িত। তারা পরিকল্পিতভাবে জব্বার মিয়া ও সানোয়ার হোসেন মকে আইভরিকোষ্ট নিয়ে যান। তিনি আরও বলেন, বিগত সময়ে আব্দুর রহমানের পরিবার জঙ্গি নাটক সাজিয়ে এই এলাকার অন্তত ৫৩টি পরিবারের সর্বস্ব লুটে নিয়েছে। আমরা তদন্তসাপেক্ষে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
অভিযোগের বিষয়ে আব্দুর রহমান মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইলে কল দিলে তার স্ত্রী ফোন রিসিভ করেন এবং সাংবাদিক পরিচয় জেনে ফোন কেটে দেন। তাঁর ছেলে জাইদুর রহমান ওরফে রিয়াদ, সানোয়ার হোসেন ও জব্বার মিয়াকে আইভরিকোস্টে পাঠানোর কথা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি আপোষ মিমাংসার আলোচনা চলছে। আগামী সোমবার পীরগাছা থানায় বসা হবে। পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) একেএম খন্দকার মহিব্বুল ইসলাম বলেন, ‘ভুক্তভোগীর এজাহার গ্রহণ করা হয়েছে। সংযুক্ত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )