


রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ না করে সালটি, ঝামা ও তৃতীয় শ্রেণির ইটের খোয়া ব্যবহার করে সড়কের কাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের ‘প্রভাতি’ প্রকল্পের আওতায় উপজেলার পূর্ব নবনীদাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বুড়িরহাট রোড পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পে বরাদ্দ রয়েছে ২ কোটি ৭১ লাখ ৯১ হাজার ৮৪৬ টাকা। প্রকল্পের আওতায় সড়ক উন্নয়ন ছাড়াও চারটি আরসিসি ইউড্রেন, চারটি কালভার্ট, একটি বক্স কালভার্ট, একটি সাড়ে তিন মিটার কালভার্ট এবং বিভিন্ন স্থানে গাইড ওয়াল নির্মাণের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ অক্টোবর ২০২৬।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের শুরু থেকেই নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সড়কের কাজে ব্যবহৃত ইটের খোয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, সালটি, ঝামা ও তৃতীয় শ্রেণির ইট ভেঙে তৈরি করা খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রায় ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি আকারের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, সড়ক নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নির্ধারিত মানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা না হলে সরকারি অর্থে নির্মিত সড়কটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কের বিভিন্ন অংশে ভাঙন ও ক্ষয় দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে খোয়া ফেলে রাখলেও রোলার না করায় যান বাহনের চলাচলের ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যা দেখা দেওয়ায় জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি অর্থে প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কের কাজ হচ্ছে। অথচ কাজে নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে এসে কাজের মান পরীক্ষা করুন। সরকারি টাকার এমন অপচয় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
স্থানীয় বাসিন্দা আলা মিয়া বলেন, সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হলে এই রাস্তা বেশি দিন টিকবে না। জনগণের চলাচলের জন্য যে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কিন্তু তারা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন।
এদিকে প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং মাঠপর্যায়ে কাজ বাস্তবায়নকারী ব্যক্তিকে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গঙ্গাচড়া এলজিইডি কার্যালয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে এমদাদুল হক, মাটিঢালি বাজার, রংপুর রোড-এর নাম বলা হয়। মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে প্রকল্পটির কাজ অন্য এক ব্যক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ‘কাজ বিক্রি’ বা সাব-ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পটির ঠিকাদার হিসেবে এমদাদুল হকের নাম রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে বর্তমানে মহব্বত আলী নামে একজন ব্যক্তি কাজটি বাস্তবায়ন করছেন। মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ নাম ও মোবাইল নম্বর তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কার নামে প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে অন্য ব্যক্তির মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়নের অনুমোদন রয়েছে কি না।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকৌশলী জয়া স্যানাল অনুপস্থিত থাকায় উপসহকারী প্রকৌশলী লুৎফর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ এবং প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। এ সময় তিনি সাংবাদিকের সঙ্গে রাগান্বিত হয়ে কথা বলেন এবং সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে।
পরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), রংপুরের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী ও গঙ্গাচড়া উপজেলা প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকা তরুণ কুমার সরকারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি খোঁজখবর নিয়ে আগামীকাল জানাবো।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান এবং কাজের পরিমাপ যথাযথভাবে যাচাই করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিম্নমানের কাজ পুনরায় মানসম্মতভাবে সম্পূর্ণ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।