


৩৬৫ দিন, এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল! এই তো সেদিন। অথচ হিসাব কষলে একটি বছর। আজ যেন ফের নতুন দিন, নতুন যাত্রা। দেশের স্থানীয় গণমাধ্যম জগতে ‘সকালের বাণী’ একেবারেই নতুন। কিন্তু ফেলে আসা একটি বছরে অনেক কিছুর স্বাক্ষী হতে পারা ‘সকালের বাণী’ আজ অগ্রযাত্রার দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করল। এ উপলক্ষে দিবাগত রাতে (৩১ অক্টোবর) আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখরিত ছিল এর প্রধান কার্যালয়।
‘সকালের বাণী’ পাঠকের হাতে উঠেছিল ২০২৩ সালের পহেলা নভেম্বর। এর আগের দিন ছিল সকালের বাণী’র প্রকাশনা উৎসব। রংপুরের ইতিহাসে এক জমকালো আয়োজন করেছিল ‘সকালের বাণী’। যা অতীতে কোনো স্থানীয় গণমাধ্যম করেনি। সেদিন আমরা বলেছিলামথসত্য, সততা, সমৃদ্ধির দৈনিক হবে সকালের বাণী। সেই স্লোগান বা প্রত্যয় লালন করে আমরা হেঁটে চলেছি এবং হেঁটে যাচ্ছি। আজ যখন পাঠকের হাতে এই সকালের বাণী, তখন আমরা ভাবছি গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাতের মতো গতকাল রাতেও কাটানো অন্যরকম আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর নির্ঘুম মূহুর্তগুলোর কথা।
গতকাল বৃহস্পতিবার শুরুটা হয় দুপুর থেকে। তখন প্রধান কার্যালয় রঙিন বেলুনে বেলুনে সাজানোর প্রস্তুতি চলছিল। বিজ্ঞাপন বিভাগ ব্যস্ত সুধিজনের শুভেচ্ছা কথা সাজাতে। মাল্টিমিডিয়া বিভাগের সহযোদ্ধারা বারবার এ্যাকশন আর কার্ট বলে ধারণ করেছে আমাদের কথা। কেউ ব্যস্ত ছিলেন খবর সম্পাদনায়। শুক্রবারের (আজকের) আয়োজন ঘিরে পরিকল্পনার ছক আঁকতে ব্যস্ত অন্যরা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, ভরপুর পুরো কার্যালয়। এবার সন্ধ্যা শেষে রাত, সবার অপেক্ষা ১২টা এক মিনিট। এদিকে পাঠকের জন্য বর্ষপূর্তির সংখ্যার সাজসজ্জাও তখন শেষান্তে।
বিভাগীয় নগরী রংপুরের গোমস্তাপাড়ায় সকালের বাণীর প্রধান কার্যালয়ে দিবাগত রাতে ঘরোয়াভাবে পত্রিকাটির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেককাটা হলো। দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ ঘিরে সব বিভাগের কর্মীরা প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, সত্য, সততা ও সমৃদ্ধির দৈনিক হিসেবে সকালের বাণী বস্তুনিষ্ঠতা ও পেশাদারত্ব বজায় রেখেছে। গত বছরেরও মতো আগামী বছরটিও পাঠকের তথ্য-চাহিদা পূরণ করাই হবে পত্রিকাটির লক্ষ্য।
সকলে এক পোশাকে আনন্দে উচ্ছ্বাসে বিদায়ী বছরের কর্মমুখর দিনগুলোর নানা স্মৃতিচারণা আর প্রকাশিত খবরকে কেন্দ্র করে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেন। অনেকেই আনন্দঘন মুহূর্তগুলোকে মোবাইলে ধারণ করে রাখেন। সেলফি তুলতেও ব্যস্ত ছিল অনেককেই। সকালের বাণীর সব বিভাগের কর্মীদের সঙ্গে বিশেষভাবে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন পত্রিকার সম্পাদক-প্রকাশক মো. হযরত আলী। সবার উদ্দেশে বলেন, ‘আমি গত বছর প্রকাশনা উৎসবে বলেছিলাম, আজো বলছি এবং সব সময়ই বলবো, সকালের বাণী একটা পরিবার। আমি আপনাদের সবার সহকর্মী। এই পরিবারের একজন সদস্য, আপনাদের সহযোদ্ধা।
গত বছরের আলোচিত সংবাদ, সাংবাদিকতা এবং সহকর্মীদের সাহস, সততা এবং নিষ্ঠার সাথে কাজ করে যাওয়ার মানসিকতার প্রসংশা করে তিনি বলেন, আমাদের কোনো এজেন্ডা নেই। আমরা কোনো দল করি না। আমাদের ভিত্তি হলো সত্য, সততা ও সমৃদ্ধি এবং সৎসাংবাদিকতা। পেশাদারত্বের সঙ্গে আমরা সাংবাদিকতা করি। আমাদের অন্য কোনো লক্ষ্য নেই। দলগতভাবে আমরা কাজটা করছি। জাতীয় উত্থান-পতনের দিনে এভাবে কাজ করা সহজ নয়। কিন্তু আমরা কারও তোয়াজ করি না। ফলে এটা সম্ভব হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। আমাদের নীতি হলোথসত্য, সততা ও সমৃদ্ধির সঙ্গে কাজ করে যাওয়া।
তিনি আরও বলেন, আমরা যেদিন প্রকাশনায় এসেছি, সেদিনই আমরা অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি এই জনপদের সম্ভাবনা ও উন্নয়নের কথা তুলে এনেছি। সেটা এখনো অব্যাহত রয়েছে। গত এক বছরে আমাদের প্রকাশনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান স্থান পেয়েছে। আমাদের সহযোদ্ধারা সংসদ নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের অনীহার কথা যেমন তুলে এনেছে, তেমনি নির্বাচনে কারচুপি, অনিয়ম, ভোট জালিয়ালি, রাষ্ট্রযন্ত্র ও ক্ষমতাসীনদের দাপটের কথাও লিখেছেন, ভিজ্যুয়াল ফ্রেমে তা তুলে ধরেছেন। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল সেটা আমরা তখনো বলেছি সাহসের সাথে। মানুষ এখনো পরিবর্তন চায়, সংস্কার চায়, সত্যিকারের জনগণের শাসন ব্যবস্থা চায়, জনপ্রতিনিধিত্ব চায়। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত নাগরিক সেবা, মৌলিক অধিকার, জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার সাথে দুর্নীতিমুক্ত নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়। যার বড় উদাহরণ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের সময় আমাদের সহকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছে। আবু সাঈদের বিরল মৃত্যুর আগমূহুর্ত ক্যামেরা বন্দি করে তা দেশবাসীকে দেখিয়েছে।
সম্পাদক হযরত আলী বলেন, গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী গণমাধ্যমের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। গণমাধ্যমে যদি পেশাদারত্ব না থাকে, সততা না থাকে, তাহলে সেই গণতন্ত্র হারিয়ে যাবে। গত এক বছরে দেশের অনেক রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী সকালের বাণী। রাজনীতির প্রতিটি অধ্যায়ে আমরা চোখ রেখেছি। পরিবর্তনের প্রতিটি পর্যায়ের খবর প্রকাশ করেছি। সেসব খবরের চুলচেরা বিশ্লেষণও করেছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। আমরা সেই কথাগুলোও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। গণমাধ্যম সংস্কারের উদ্যোগ সরকার নিয়েছে, এটা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। এই সংস্কারের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হবে প্রতি গণমাধ্যম, এই চাওয়া সবার। এই সরকারকে আমরা যেমন সমর্থন দেব, তেমনি এই সরকারের ভুলত্রুটিও ধরিয়ে দেব। ভুল ধরিয়ে না দিলে তারা বুঝতে পারবেন না যে, কোথায় আছেন।

আনন্দমুখর এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত কর্মীদের তুমুল হর্ষধ্বনির মধ্যে শুভেচ্ছা কথা শেষ করেন সম্পাদক ও প্রকাশক মো. হযরত আলী। এ সময় নির্বাহী সম্পাদক মেহেদী হাসান, বার্তা সম্পাদক এস এম ইকবাল সুমন, পরিকল্পনা সম্পাদক ফরহাদুজ্জামান ফারুকসহ উপস্থিত নতুন প্রত্যয়ে কাজ করার অঙ্গীকারও করেন। নির্বাহী সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, আমরা গত বছরের ৩১ অক্টোবর থেকে মূল পত্রিকা প্রকাশ করি। এর আগের দিন অনেক বড় পরিসরে প্রকাশনা উৎসব করেছিলাম। এমনটা রংপুরে আর কোনো পত্রিকার ক্ষেত্রে আগে ঘটেনি। দেশের অনেক মিডিয়ায় নানা গ্রুপিং ও দলবাজি থাকলেও সকালের বাণীতে সেই সুযোগ নেই। আমরা গণমানুষের গণমাধ্যম হতে চাই, সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাবে সকালের বাণী।
বার্তা সম্পাদক এস এম ইকবাল সুমন বলেন, সবখবরই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটি প্রকাশের আগে আমরা পাঠক, সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্রের প্রত্যাশার কথা চিন্তা করি। কারণ সৎ সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠ নীতিমালা ধারণ না করে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আমরা উত্তরাঞ্চলের মানুষের কথা তুলে ধরছি, তেমনি দেশ-বিদেশের ঘটনাগুলোকে সামনে রেখেছি। পাশাপাশি সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান-দর্শন-ধর্ম নিয়ে আমরা সাপ্তাহিক আয়োজনে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করে যাচ্ছি। এ জন্যই সকালের বাণী এক বছরের মধ্যেই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আমরা এই ধারা অব্যাহত রাখব।
পরিকল্পনা সম্পাদক ফরহাদুজ্জামান ফারুক বলেন, সাংবাদিকদের সত্যনিষ্ঠ হওয়া জরুরি। পত্রিকায় নিরপেক্ষতা ফুটিয়ে তোলার জন্য এর কোনো বিকল্প নেই। সকালের বাণী প্রতিনিয়ত সত্য ও সুন্দরকে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করে চলেছে। আজ থেকে ৩৬৫ দিন আগে সকালের বাণীর স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়েছিল। স্থানীয় সংবাদপত্রের জগতে এটি একদিন শীর্ষে পৌঁছাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সকালের বাণীর বর্ষপূর্তিতে আরও স্মৃতিচারণা করেন অনলাইন ইনচার্জ ও স্টাফ রিপোর্টার বিপ্লব হোসেন অপু, মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ ও স্টাফ রিপোর্টার একেএম সুমন মিয়া, স্টাফ রিপোর্টার সেলিম সরকার, সাহিত্যপাতা সকালের সাহিত্য’র বিভাগীয় সম্পাদক জাকির আহমদ, শিশুপাতা ভোরের পাখি’র বিভাগীয় সম্পাদক মুস্তাফিজ রহমান, নারীপাতা রোকেয়া’র বিভাগীয় সম্পাদক শাকিলা পারভীন, স্টাফ ফটোসাংবাদিক আসাদুজ্জামান আফজাল, বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, কম্পিউটার ইনচার্জ (গ্রাফিক্স ডিজাইন) মো. ফারুক হোসেন ফিরোজ, মো. শামসুল ইসলাম বুলবুল, ভিডিও এডিটর মেহেদী হাসান মিল্টন, ক্যামেরাপার্সন (ভিডিও) আশিক মিয়া, সার্কুলেশন ম্যানেজার স্বপন মিয়া, অফিস সহায়ক জুয়েল মিয়া ও রন্ধনশিল্পী বিলকিস বেগম।
অগ্রযাত্রার নতুন প্রত্যয় আর অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে শেষ হয় আনন্দমুখর এ অনুষ্ঠানটি। দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করল সকালের বাণী। এ উপলক্ষে আজ শুক্রবার রংপুর কোতয়ালী থানা রোডে বেলা তিনটায় পুলিশ কমিউনিটি সেন্টারে আনন্দ র্যালি, আলোচনা সভা, কেককাটা ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আমাদের আয়োজনে সকল পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভাকাঙ্ক্ষী ও শুভান্যুধায়ীসহ পুরো সাংবাদিক সমাজকে আমন্ত্রণ। সকালের বাণীর সাথে থাকুন সত্য, সততা ও সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অনুপ্রাণিত করুন।