


নির্বাসিত জীবন কাটানোর যন্ত্রণা শেষ করে দীর্ঘ দেড় দশক পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার আজ দেশে ফিরে আসা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দেশের চলমান নির্বাচনী রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড়ো ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে আবির্ভূত হবে বলে সহজেই অনুমান করা যায়।
তারেক জিয়ার অনুপস্থিতিতেও বিএনপি গত দেড় দশক তাঁর নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি সবসময় যেকোন সমসাময়িক বিষয় নিয়ে দলের প্রতিটি স্তরের নেতা-কর্মীর সাথে যুক্ত ছিলেন। তবে সশরীরে দেশে অবস্থান করে রাজনীতির মাঠে থাকা আর দেশের বাহিরে থেকে দল পরিচালনার মধ্যে যে গুণগত পার্থক্য রয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর দেশে ফেরার বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে। এটি ভোটের মাঠে দলটির সাংগঠনিক শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তারেক জিয়ার দেশে ফেরা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটের সমীকরণে বেশ পরিবর্তন হবে এটা বলাই যায়।
বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি তৃণমূল। তারেক জিয়া এখন সরাসরি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিলে ঝিমিয়ে পড়া বা কোণঠাসা নেতা-কর্মীরা পূর্ণ শক্তিতে মাঠে নামবে, যা দলের বাহিরের ভোট বা সমর্থন বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। দেশের একটি বড় অংশ তরুণ ভোটার, যারা বিগত তিনটি নির্বাচনে সেভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তারেক জিয়ার ‘নতুন ধারার রাজনীতি’ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবনাগুলো যদি তরুণ প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছানো যায়, তবে তা ভোটের পাল্লা ভারী করতে পারে অনেক যা ভোটের রাজনীতিতে দলের সহায়ক হবে। তাঁর ফেরা কেবল বিএনপির একক শক্তিতে নয়, বরং মিত্র দলগুলোর সাথে দরকষাকষিতেও প্রভাব ফেলবে। জোটবদ্ধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর সরাসরি নেতৃত্ব জোটের ঐক্যকে আরও সংহত করতে পারে।
তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যে কেবলই মসৃণ হবে, তা বলা যায় না। বিগত সরকারের সময় তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া অসংখ্য মামলা এবং জনমনে বিভিন্ন কৃত্রিম বিতর্কের পাহাড় ডিঙিয়ে একটি ‘ক্লিন ইমেজ’ তৈরি করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিরোধীরা প্রায়ই বিভিন্ন ইস্যু সামনে এনে তাঁর নেতৃত্বের সমালোচনা করে। ভোটের রাজনীতিতে জয়ী হতে হলে তাঁকে কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং যুক্তিনির্ভর এবং জনবান্ধব কর্মসূচি দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় পৌঁছাতে হবে।
তারেক জিয়া ইতোমধ্যে ‘৩১ দফা’ সংস্কার প্রস্তাবনার কথা বারবার বলেছেন। তাঁর দেশে ফেরা এই প্রস্তাবনাগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করবে। ভোটাররা এখন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন চায় না, তারা চায় গুণগত পরিবর্তন। যদি তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে, তাঁর ফেরা মানেই প্রতিহিংসার রাজনীতি নয় বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা, তবে সেটি ভোটের রাজনীতিতে এক বৈপ্লবিক মোড় নিয়ে আসবে।
পরিশেষে বলা যায়, তারেক জিয়ার দেশে ফেরা বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনিবার্য বাস্তবতা। তিনি দেশে আসার পর কীভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন, তার ওপর নির্ভর করছে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মূল প্রেক্ষাপট। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যদি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, বরং জাতীয় ঐক্যের ডাক হিসেবে আসে, তবে তা বাংলাদেশের লোকতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে। ভোটের রাজনীতিতে তাঁর উপস্থিতি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলায়তন ভেঙে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ সুগম করতে পারে। এতে করে তার ঘোষিত ‘৩১ দফা’ রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজতর হবে, আর দীর্ঘদিনের প্রচলিত শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা সম্ভব হবে।
তারেক জিয়া যদি দেশে আসার পর তৃণমূল পর্যায়ে এই ৩১ দফার সুফলগুলো সাধারণ মানুষের ভাষায় বুঝিয়ে বলতে পারেন, তবে তা ভোটের রাজনীতিতে বিএনপির জন্য একটি বিশাল বড় ‘পজিটিভ পয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করবে। এটি কেবল দলীয় সমর্থকদের নয়, বরং দোদুল্যমান বা নিরপেক্ষ ভোটারদেরও দলের দিকে টানতে সাহায্য করবে।