


সম্প্রতি গরু জবাই বন্ধ নিয়ে আলোচিত নাগেশ্বরীর ভিতরবন্দ ইউনিয়নের ডাকনিরপাঠ বাজারটি গরু জবাই না করার শর্তে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে অক্টোবর মাসে বাজারটি প্রতিষ্ঠা করেন ওই এলাকার সচেতন হিন্দু মুসলিম মিলে। বাজারটি প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের আগে সেখানে ডাকনিরপাঠ নামে একটি মন্দির রয়েছে। ওই এলাকাটি হিন্দু অধ্যষিত। প্রতিষ্ঠাকারীল উদ্যোগতার উত্তরসুরীরা জানান, উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নে হিন্দু অধ্যুষিত ডাকনিরপাট একটি ঐতিহ্যবাহী এলাকা। ভারত বিভক্তের আগে থেকে এখানে ছিল একটি কালী মন্দির ও ডাকিনী-যোকিনীর পাট। বছরের বেশিরভাগ সময়ে এখানে পুজা-অর্চনা হত। এখনো হয়ে আসছে। এখানে বসবাসরত মানুষের মধ্যে ছিল শান্তিপুর্ন ।
সহাবস্থান। ১৯৮৮ সালে স্থানীয় গণ্যমান্য দেলোয়ার হোসেন, আব্দুর রহমান সরকার, ইব্রাহীম আলী, ডা: বীরেন চন্দ্র, খোকা রায়সহ বেশ কয়েকজন এখানে বাজার বসান। তখন তারা প্রতিশ্রুতি দেন যেহেতু এখানে একটি ঐতিহ্যবাহী মন্দির রয়েছে এবং চারপাশে হিন্দু সম্প্রদায় বসবাস করেন সেহুতু বাজারে কোনদিন গরু জবাই করা হবে না। সেই থেকে চলে আসছে এ ধারাবাহিকতা। সম্প্রতি এ বাজারে জনৈক আজিজুল ইসলাম তার দোকানের পাশে দুজন মাংস ব্যাবসায়ী আ: ছালাম ও আবু সিদ্দিককে বসিয়ে দেন। সেখানে তারা গরু জবাইয়ের চেষ্টা করলে সকল ধর্মের মানুষ এর আপত্তি জানায়। এর প্রতিবাদ জানিয়ে ২ এপ্রিল ইউপি চেয়ারম্যান, নাগেশ্বরী থানাসহ সংশ্লিষ্ঠ।
বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন সনাতন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের মানুষ। এর সরেজমিন গিয়ে তদন্ত করে থানার দুজন কর্মকর্তা এস.আই অপুর্ব রায় ও এস.আই মকবুল হোসেন স্থানীয় সুধীজন, সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষ ও আজিজুল, দুজন মাংস ব্যাবসায়ী আব্দুস ছালাম, আবু সিদ্দিককে থানায় ডাকেন। ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় ওসি আব্দুল্লাহ হিল জামান থানা চত্বরে উপজেলা বিএনপি আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজার উপস্থিতিতে সকলকে নিয়ে বসেন। সেখানে আজিজুল, দুজন মাংস ব্যাবসায়ী আব্দুস ছালাম, আবু সিদ্দিক কথা দেন এলাকার ঐতিহ্য রক্ষায় সম্প্রীতি বজায় রাখতে তারা ডাকনিরপাট বাজারে গরু জবাই করবেন না। পরদিন বিভিন্ন ঘণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ হলে বিষয়টি সারাদেশব্যাপি আলোচনা সৃষ্টি করে এর্ স্থানীয়দের মাঝে উত্তেজনা বাড়ে। ফলে দীর্ঘদিনের শান্তিপুর্ন সহাবস্থান নষ্টের আশংকা দেখা দিয়েছে । এ ঘটনায় বিব্রত হয়ে পড়েছেন দুই সম্প্রদায়ের সচেতন মানুষ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ারুল ইসলাম শহিদ, আহাদ আলী, সোবাহান ব্যাপারী, অনিল সেন, কার্তিক রায়, সুনিল বর্মণ জানান, আমরা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রেখে এলাকায় শান্তিপুর্ন সহাবস্থান করে আসছি। একজন ব্যাক্তির কারনে আজ তা হুমকির মুখে। এটি কখনো কাম্য নয়। অল্প দুরে বেশ কয়েকটি বাজারে তো গরুর মাংস বিক্রি হয়। সেখান থেকেও অনেকেই কিনে আনে। এতে তো তাদের কোন সমস্যা নেই। এখানে গরু জবাই করতে হবে এর তো কোন মানে নেই। আমরা মনে করি এটি পরিকল্পিতভাবে শান্তিপুর্ন এলাকাটিকে অশান্ত করার অপচেষ্টা মাত্র। আমরা এর প্রতিবাদ জানাই। স্থানীয় সংবাদকর্মী নূরুজ্জামান জানান, আমার বাবা দেলোয়ার হোসেন প্রথম উদযোগ নিয়ে বাজারটি গঠন করেন। সেসময় গরু জবাই বা এর মাংস বিক্রি না করা শর্তে বাজারটি প্রতিষ্ঠা হয়। তখন থেকে এখন পর্যগন্ত সে নিয়ম ভাঙ্গা হয়নি। সম্প্রতি আজিজুল ইসলাম বাজারে মার্কেট করে ভারা দিয়েছেন। সেখানেই গরু জবাই করা হয়েছিলো।
আজিজুল ইসলাম জানান, আমার জায়গা আমি ভাড়া দিয়েছি। সেখানে ভাড়াটিয়া কি করবে, না করবে তাতে অন্য মানুষের কি আসে যায়। ভিতরবন্দ ইউপি চেয়ারম্যান শফিউল আলম শফি জানান, মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষায় দুই ধর্মের মানুষের পারস্পরিক সমঝোতায় ডাকনিরপাট বাজারে কোনদিন গরু জবাই হয়নি। এখন একটি মহল সে ধারাবাহিকতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করে এলাকাটিকে অশান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটা হতে দেয়া হবে না। উপজেলা বিএনপি আহ্বায়ক গোলাম রসুল রাজা বলেন, একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিবাচক দৃষ্টান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটি অগ্রহনযোগ্য। নাগেশ্বরী থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল্লাহ হিল জামান জানান, থানায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে মার্কেট মালিক নিজেই এলাকার শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গরুর মাংস বিক্রি না করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এতে পুলিশ প্রশাসন বা কোন রাজনৈতিক দলের চাপ ছিল না।