গরুর গোবর সাধারণত জৈব সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এতে জমির উর্বর শক্তি বাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ, লাকড়িসহ রান্নার কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় গৃহবধূরা গরুর গোবর থেকে জ্বালানি লাকরি তৈরি করছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলে অনেকেই ঝুঁকছেন কাঠ-খড়-লাকড়ির দিকে।
গ্রামাঞ্চলের গৃহবধূদের কাছে রান্নার কাজে সাশ্রয়ী জ্বালানি হিসেবে ইদানীং বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গরুর গোবরের প্রলেপ দেওয়া এই বিশেষ এক খড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত গোবরের নাড়ু হিসেবে। সর্বত্রই এখন চোখে পড়ছে বিশেষ এই জ্বালানিটি। প্রতিটি গ্রামীণ জনপদে গোবরের নাড়ুর ব্যবহার অনেক আগে থেকেই লক্ষ করা যায়।
কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়া পেয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এখন চলে গেছে গ্যাস-বিদ্যুৎ। সরে এসেছিলেন রান্নাবান্নার প্রাচীন পদ্ধতি থেকে। কিন্তু জ্বালানি সংকটের নতুন এই পরিস্থিতি আবার তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আগের ব্যবস্থায়। এই উদ্ভূত পরিস্থিতে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে কদর বাড়ছে গ্যাস-বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে এসব জ্বালানি।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, গৃহবধূরা গৃহপালিত গরুর গোবর দিয়ে নাড়ু ও শলা তৈরি করছেন। বাড়ির উঠানে, বাইরে খোলা জায়গায় পিঁড়িতে বসে ঘোমটা টেনে খোশগল্পে মেতে তৈরি করছেন গোবরের নাড়ু। সামনে রয়েছে ডালিভর্তি গোবর, বালতি ভরা পানি, পাটখড়ি, ধানের তুষ। এক সময় গ্রামের মানুষ বন-জঙ্গলে খড়কুটা ও লতাপাতা কুড়িয়ে জ্বালানি হিসেবে রান্নার কাজে ব্যবহার করত।
কালের আবর্তনে বাড়ির পাশে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক বন-জঙ্গল কেটে ফেলার কারণে সেই জ্বালানিরও সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে ধনী ও বড় গৃহস্থ পরিবারের গৃহবধূরা গ্যাস দিয়ে বা খড়ি ক্রয় করে রান্না করলেও চরম বেকায়দায় পড়েছেন গরিব ও নিম্ন আয়ের পরিবারের গৃহবধূরা। গ্যাস বা কাঠখড়ি ক্রয় করতে না পেরে গৃহপালিত গরুর গোবর দিয়ে নাড়ু ও লম্বা শলা তৈরি করেন।
বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালে ঘুম থেকে ওঠেই গোয়ালঘরে প্রবেশ করেন তারা। ডালিভর্তি করে বের করেন গোবর। গোবরের সঙ্গে মেশানো হয় ধানের তুষ বা গুঁড়া। এরপর ২-৩ হাত লম্বা পাটের শলা দিয়ে তৈরি করেন নাড়ু। কাঁচা গোবরের তৈরি নাড়ু শুকানোর জন্য বাড়ির উঠানে রোদে আড় বেঁধে দাঁড় করে রাখা হয়।
৫ থেকে ৬ দিন পরই শুকিয়ে যায় নাড়ুগুলো। এভাবেই প্রতিদিনের তৈরি শুকনো নাড়ু মজুদ করে রাখা হয় ঘরে। এদিকে দিন দিন জ্বালানির চাহিদা হিসাবে গরুর গোবরের তৈরী লাকড়ি ব্যবহার করায় কৃষি খাতে কৃষকদের ফসল উৎপাদনের প্রধান জৈব সার হিসাবে গরুর গোবরের সংকট তৈরির আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
কুরুষাফেরুষা এলাকার গৃহবধু শাপলা রানী ও প্রতিমা রানী জানান, আমাদের দুটি গাভী আছে। চাষবাদ করার করার পর অবশিষ্ট গোবরগুলো দিয়ে জ্বালানি তৈরি করি। প্রতিদিন সকালে গোয়ালঘর থেকে গোবরগুলো একত্রিত করে একটি পাট কাটি দিয়ে তিন থেকে চারটি শলা তৈরী করে রোদে শুকিতে দেই। তিন চার দিন শুকানোর পরে চুলায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। জ্বলেও ভালো।