


হরমুজ প্রণালি লাগোয়া ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের মধ্যে ৩০টিই পুনরায় সচল করেছে ইরান। একই সঙ্গে যুদ্ধের আগের তুলনায় তাদের প্রায় ৭০ শতাংশ অস্ত্রভাণ্ডার এখনো অক্ষত রয়েছে। ফলে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ সরবরাহকারী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সামরিক উত্তেজনা নতুন মোড় নিতে পারে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের মধ্যে ৩০টিই পুনরায় সচল করেছে ইরান। পাশাপাশি যুদ্ধের আগের অস্ত্র ভাণ্ডারের প্রায় ৭০ শতাংশই অক্ষত রয়েছে দেশটির। এর ফলে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের ২০ শতাংশ সরবরাহকারী এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সামরিক উত্তেজনা আবারও নতুন করে শুরু হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বলেছেন, ইরান ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডারের প্রায় ৯০ শতাংশই পুনরায় সচল করতে সক্ষম হয়েছে। এসব গুদামে বিপুল পরিমাণ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন গোয়েন্দারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যদি বর্তমান অস্ত্রবিরতি চুক্তি ভেস্তে যায়, তাহলে টমাহক ও প্যাট্রিয়টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের সংকটে থাকা মার্কিন বাহিনী বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। গত মঙ্গলবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এই গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্প প্রশাসনের গত কয়েক সপ্তাহের দাবিকে অনেকটা নস্যাৎ করে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করে আসছিল, তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং নৌবাহিনীকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস’ করে দিয়েছে। বিপরীতমুখী তথ্যের ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী চলমান জ্বালানি সংকট আরও কয়েকমাস দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৬০ থেকে ৭৫ ডলারের মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত মার্চ থেকে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ থেকে ১১০ ডলারের ঘরে অবস্থান করছে। যদিও এপ্রিলে মাত্র তিন সপ্তাহ এই তেলের দাম কিছুটা কম ছিল। এর ফলে তেল আমদানিকারক দেশগুলোকে কোটি কোটি ডলার বাড়তি গুনতে হচ্ছে। ভারতের তেলের চাহিদার প্রায় ৮৯ শতাংশই আমদানি করা হয়; যার ৪০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ভারত আমদানির উৎস বহুমুখী করেছে এবং সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে কেন্দ্রীয় কর কমিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলোকে (ওএমসি) বর্ধিত খরচ ও ঝুঁকি বিমার বোঝা সামলে নিতে সহায়তা করেছে। চলতি সপ্তাহে নরেন্দ্র মোদির সরকার জোর দিয়ে বলেছে, দেশে পর্যাপ্ত তেল ও গ্যাসের মজুদ রয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি কি তবে ফাঁকা বুলি?
যুদ্ধের পঞ্চম দিনে (৪ মার্চ) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘‘তাদের (ইরান) কোনও নৌবাহিনীই আর অবশিষ্ট নেই; সব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনও বিমানবাহিনী বা রাডার ব্যবস্থাও নেই।’’
যুদ্ধের ৩৪তম দিনে (২ এপ্রিল) তিনি আবারও বলেন, ‘‘ইরানের নৌবাহিনী শেষ, বিমানবাহিনী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং তাদের বেশিরভাগ নেতাই এখন মৃত।’’ ট্রাম্পের সুরেই গত ৪০ দিন ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং হোয়াইট হাউসের সামাজিক মাধ্যমগুলোতে একই কথা বারবার প্রচার করা হচ্ছে। গত মার্চে এক সংবাদ সম্মেলনে হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ‘‘শয়তান এই জান্তার (ইরান) সামরিক সক্ষমতা ভেঙে পড়ছে।’’
এপ্রিলে অপর এক টেলিভিশন ভাষণে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, ইরান আক্ষরিক অর্থেই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে; তাদের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোর ৭৫ শতাংশ ধ্বংস এবং বাকিগুলো তছনছ হয়ে গেছে।
তবে চলতি সপ্তাহে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে, যা এর আগে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ ও এপ্রিলে প্রকাশিত অন্যান্য প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল। এসব প্রতিবেদনে মার্কিন ও মিত্র দেশগুলোর গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, ৩৫ দিনে ১৩ হাজারেরও বেশি ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরও তেহরানের হাতে এখনও ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র অক্ষত রয়েছে।
এছাড়া গত এপ্রিলের শুরুর দিকে মার্কিন আরেক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে আরও ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তেহরানের হাতে এখনও কয়েক হাজার ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’ রয়েছে, যা তাদের মোট ক্ষমতার প্রায় অর্ধেক।
ভেস্তে যাওয়ার শঙ্কায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি
ইরানের সামরিক শক্তি ট্রাম্প প্রশাসনের দাবির মতো শেষ হয়ে যায়নি—এমন খবরের পরপরই আভাস পাওয়া যাচ্ছে, হামলা আবারও শুরু হতে পারে। তেহরানের পক্ষ থেকে দেওয়া সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবকে ট্রাম্প ও হেগসেথ ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।ট্রাম্প ও হেগসেথ বলেছেন, মার্কিন বাহিনী ইরানকে ‘পুরোপুরি পর্যুদস্ত’ করেছে। ইরানের প্রস্তাবে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি, অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কর্তৃত্ব স্বীকারের শর্ত দেওয়া হয়েছিল। এর জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, ‘‘আমরা একটি চুক্তিতে পৌঁছাব, নতুবা তারা ধুলোয় মিশে যাবে।’’
ওয়াশিংটন বর্তমানে কোনোভাবেই ইরানকে যুদ্ধের খরচ দেওয়া বা হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে রাজি নয়। ট্রাম্প বলেছেন, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ত্যাগ না করলে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবেন না তিনি। এর ফলে মাত্র দুটি পথ খোলা রয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি অচলাবস্থা চলবে; যা বিশ্বের জন্য দুঃসংবাদ। অথবা কোনও এক পক্ষ থেকে চাপ সৃষ্টির ফলে আবারও সামরিক লড়াই শুরু হবে এবং তা আরও ভয়াবহ রূপ নেবে। আর সেখানেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আসা মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার খবর অস্বীকার করলেও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে গেছে? প্রশ্নই ওঠে না, বলছে আইআরজিসি। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে ইরানি সামরিক বাহিনীর বক্তব্যেরও মিল পাওয়া যাচ্ছে। ইরান বারবার দাবি করছে, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সবচেয়ে বড় সমরাস্ত্রের মজুদ এখনও ফুরিয়ে যাওয়া থেকে অনেক দূরে রয়েছে। গত সপ্তাহে ইরানের এক সংসদ সদস্য তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে বলেছেন, তাদের যে মজুদ আছে তা দিয়ে বছরের পর বছর যুদ্ধ চালানো সম্ভব। আর মার্চে ইরানের ইসলাসিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এক মুখপাত্র সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘‘আমাদের উন্নত অস্ত্রগুলোর বেশির ভাগই এখনও ব্যবহার করা হয়নি।
ইরান এখন পর্যন্ত তাদের পুরোনো মজুদ থেকে মাত্র ৩ হাজার ৬০০ ড্রোন এবং ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।’’ যদি আমেরিকার অস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ার তথ্যটি সামান্যও সত্যি হয়, তাহলে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করলে ওয়াশিংটন চরম ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং তাইওয়ান নিয়ে চীনের তৎপরতার প্রেক্ষাপটে মার্কিন মিত্ররা এখন বেশ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিংও এই যুদ্ধকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে; যাতে ভবিষ্যতে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মক সামরিক সক্ষমতার সব সীমাবদ্ধতা শনাক্ত করা যায়।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট।