1. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
  2. [email protected] : Sokaler Bani : Iqbal Sumon
  3. [email protected] : Md Hozrot Ali : Md Hozrot Ali
ত্রয়োদশ নির্বাচন: ভাববার আছে অনেক কিছু | দৈনিক সকালের বাণী
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১৪ অপরাহ্ন

ত্রয়োদশ নির্বাচন: ভাববার আছে অনেক কিছু

স্বপন চৌধুরী
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৬৭ জন দেখেছেন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংবাদ সংগ্রহের সময় শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে পারেন বলে মনে করেন ৮৯ শতাংশ সাংবাদিক। নারী সাংবাদিকদের মধ্যে ৫০ শতাংশ যৌন হয়রানি এবং ৪০ শতাংশ যৌন আক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। অবাধ ডিজিটাল পরিসরের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের এক জরিপের ফলাফলে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে গবেষণার এমন ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ঘোষণা রয়েছে। তার আগে ‘হাই রিস্ক, লো প্রিপেয়ার্ডনেস: জার্নালিস্ট সেফটি ইন ২০২৬ ইলেকশন’ শিরোনামের গবেষণাটি চালায় ডিজিটালি রাইট।

১৯টি জেলার ২০১ জন সাংবাদিকের ওপর মতামতের পাশাপাশি ১০টি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। জরিপে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ মৌখিক হয়রানি এবং ৭১ শতাংশ ভীতি প্রদর্শনকে প্রধান ঝুঁকি বলে মনে করেন। ৯০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা শারীরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল এবং দলগুলোর কর্মীদের দিক থেকে ঝুঁকির আশঙ্কা প্রকাশ করেন। নারী ও আঞ্চলিক সাংবাদিকরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকেও উল্লেখযোগ্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নির্বাচনী সংবাদ সংগ্রহ করার সময় শারীরিক হুমকির পাশাপাশি ডিজিটাল হয়রানিও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সাংবাদিকরা। ৭৫ শতাংশ সাংবাদিক বলেছেন, তাঁদের বা তাঁদের সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি।

৬৫ শতাংশের কাছে হ্যাকিং একটি বড় ঝুঁকি। নারী সাংবাদিকরা অনলাইনে হয়রানি ও নজরদারি নিয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উত্তরদাতাদের অর্ধেকের বেশি মনে করেন, তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে মানহানিকর প্রচারও চালানো হতে পারে। সাংবাদিকরা মনে করছেন, রাজনৈতিক লেবেলিং (পরিচয় আরোপ করা), গণমাধ্যমের ওপর আস্থার অভাব, উগ্রবাদ, গণপিটুনি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা এবং সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে ছড়ানো অপতথ্য এবারের নির্বাচনে ঝুঁকি বাড়ার মূল কারণ। জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ সাংবাদিক মনে করেন, এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি কোনো সংবাদমাধ্যমের নেই। নিরাপত্তাহুমকি মোকাবিলার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা কাঠামো তাদের প্রতিষ্ঠানে নেই। ২৪ শতাংশ উত্তরদাতা তাদের নিয়োগকর্তার কাছ থেকে নিরাপত্তা সরঞ্জাম বা প্রশিক্ষণ পাওয়ার কথা জানিয়েছন। ৭৭ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের সংবাদমাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা নীতিমালা নেই। ডিজিটালি রাইটের জরিপ প্রতিবেদনে নির্বাচনে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তার মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, সংবাদমাধ্যমে সুস্পষ্ট নিরাপত্তা প্রোটোকল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, জেন্ডার-সংবেদনশীল সুরক্ষাব্যবস্থা এবং জরুরি ও আইনি সহায়তা পাওয়ার উন্নত সুযোগ।

শুধু নির্বাচন বলে কথা নয়, বিগত বছর ২০২৫ সালে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আগের বছর একই সময়ে মব সহিংসতায় অন্তত ১২৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ভয়াবহ এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, আসকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এবং সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রস্তুত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে কমপক্ষে ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। এ সময় নারী, পুরুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বহু মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও বাউল সম্প্রদায়ের সদস্যদের হেনস্তা, মারধর এবং জুতার মালা পরানোর ঘটনাও ঘটেছে।

আসকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে ঢাকায় ২৭ জন, গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে নয় ও কুমিল্লায় আটজন নিহত হন। ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী, গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে নিহত হন ছয়জন করে। লক্ষ্মীপুর ও সিরাজগঞ্জে পাঁচজন করে এবং নরসিংদী ও যশোরে মবের শিকার হয়ে চারজন করে প্রাণ হারান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গণপিটুনির ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত সাতজন, নারী তিনজন এবং একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছিলেন, যা সামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতার অসম প্রভাবকে স্পষ্ট করে। আসক জানায়, রাজনৈতিক ভিন্নমত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ মব সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার ৩৮টি ঘটনার মধ্যে শারীরিক নির্যাতন, যৌথ বাহিনীর হেফাজত এবং তথাকথিত ‘গুলিতে’ বা বন্দুকযুদ্ধে ২৬ জন নিহত হন। থানায় হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অন্তত ১২টি। ২০২৪ সালে বিচারবহির্ভূত হত্যায় নিহত হয়েছিলেন ২১ জন। একই বছরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কমপক্ষে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাজতি ৬৯ ও কয়েদি ৩৮ জন। সর্বোচ্চ ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে পরিকল্পিত হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এতে সাংবাদিক ও কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন এবং পত্রিকা দুটির মুদ্রিত ও অনলাইন সংস্করণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর আঘাত। আসক বলেছে, বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ মানবাধিকার। ভিন্নমত প্রকাশের কারণে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ ও মামলা-গ্রেপ্তারের আশঙ্কা গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করছে। আসকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে দেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং প্রায় ৪ হাজার ৮৪৪ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন। এদের মধ্যে তিনজন নিহত হন এবং চারজনের মরদেহ রহস্যজনকভাবে উদ্ধার করা হয়। ২০২৫ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে বসতঘরে অগ্নিসংযোগ, মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাংচুর ও জমি দখলের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় একজন নিহত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হন। একই সময়ে একটি বৌদ্ধ মন্দিরেও হামলার ঘটনা ঘটে।

ঘটনাবহুল ২০২৫ সালকে বিদায় জানিয়ে এখন আমরা ২০২৬ সালে অবস্থান করছি। নূতন বছর নূতন সম্ভাবনা বয়ে আনবে এমনটাই বিশ্বাস সবার। নতুন বছরের শুরুতেই রাজনৈতিক দলগুলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোটাররা অপেক্ষায় আছেন সুষ্ঠু, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে কাঙ্খিত সেই নির্বাচন। আমরা জানি, দেশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে দীর্ঘ সময় মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। তাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশ-বিদেশে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে সুযোগ এসেছে, তা কাজে লাগাতে হবে। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ কাজ করছে।

বিশেষ করে এই নির্বাচনেরই সম্ভাব্য প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড সেই উদ্বেগের আগুনে ঘী ঢেলেছে। মব সহিংসতা চলছে দেশের নানা প্রান্তে। এসব পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকার কঠোরহস্তে সামাল দিতে পারেনি। তবে আমাদের প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতে তারা এ ব্যাপারে সচেষ্ট থাকবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর পরবর্তী সরকারকেও আইনশৃঙ্খলায় বিশেষ নজর দিতে হবে। নূতন বছর নূতন সম্ভাবনা নিয়ে আসুক, সবাই চাই। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি অনুসরণ না করলে তা অর্জন করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারকেও ভাবতে হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক সকালের বাণী
Theme Designed BY Kh Raad ( Frilix Group )