


সরকার আসে, সরকার যায়। তিস্তা সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেয় সবাই। কিন্তু নদীপারের মানুষের ভাগ্যের উন্নতি হয়না। সবশেষ চব্বিশের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল ভূক্তভোগী মানুষদের আস্থার জায়গা। অন্তত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুটা হবে-এটাই ছিল তিস্তাপারের মানুষের চাওয়া। সরকারও কথা দিয়েছিল, জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তিস্তা প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। কিন্তু শেষতক নির্বাচনের স্রোতে স্বপ্নের সে গুড়েও বালি পড়েছে।
বিএনপি সরকার গঠন করেছে, বিদায় নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ফের অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ। যদিও সরকার গঠনের পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রংপুরে প্রথম দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সাংবাদিকদের বলেন, তিস্তা নদী নিয়ে আর কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হবে না। এই অঞ্চলের দুই কোটি মানুষের আকাঙ্খা তিস্তাকে ঘিরে। আমরা সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে তিস্তা খনন, কিংবা তিস্তার উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে নদী শাসন ও খননেন কাজ করবো। বিএনপি একটি জনবান্ধব রাজনৈতিক দল। তাই অল্প সময়ের মধ্যে জনগণের দাবিগুলো বিবেচনায় নিয়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ডামাডোল বাজিয়েছিল অনেক। চীনের প্রতিনিধিসহ তিস্তা নদী পরিদর্শন, সম্ভাব্যতা যাচাই নদীপারের মানুষের মাঝে জেগেছিল আশার সঞ্চার। কিন্তু দুর্ভোগের শিকার মানুষগুলো জানেনা তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধুই ‘রাজনৈতিক দাবার গুটি’। ভারতের সিকিম থেকে নেমে আসা তিস্তা নদী নীলফামারী ও লালমনিরহাট পেরিয়ে রংপুর-গাইবান্ধা হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী স্পর্শ করেছে। সেখানে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে তিস্তার প্রবাহ। উত্তরের পাঁচ জেলার জীবন রেখাখ্যাত এ নদী এখন পানিশূন্য। পাল্টে গেছে খরস্রোতা তিস্তার চিত্র, আবার ক’দিন পরে সৃষ্ট বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে নদীপারের ঘরবাড়ি। ভাঙন তো সেখানকার মানুষের জন্য অভিশাপ।
তবুও স্বপ্ন দেখেন তিস্তাপারের মানুষ। একদিন সব ঠিক হবে, অভিশাপের তিস্তাই আশীর্বাদের তিস্তা হয়ে দেখা দেবে। আক্ষেপ করে নদীপারের মানুষজন বলেন, এদ্দিন তো দ্যাকনো, হামার দু:খ কায়ও দ্যাকে নাই। হামাক খালি ধোকা দিচে। এবার ভোট নিবার জন্যে সবায় কতা দিচে। এইবার যদি তিস্তা নদীর কাম না হয়, তাইলে আর কোনোদিনও হবার নয়। স্থানীয় লোজনসহ চরের কাজ ফেলে কৃষি শ্রমিকরা ছোট ছোট দোকানের সামনে টেলিভিশনে দেখছিলেন মন্ত্রী পরিষদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। এসময় মহিপুর এলাকার কৃষি শ্রমিক হোসেন আলী বলেন, এক সময়ের বড় গেরস্ত হামরা। এই তিস্তায় হামাক ফকির বানাইচে। নয়া সরকার যদি কাম না করে হামার মরণ ছাড়া বুদ্দি (উপায়) নাই। গৃহবধু লাইলী বেগম বলেন, ভোটের আগোত এই তারেক রহমান তো তিস্তার কতা কইচে। হামরাতো সেই আশায় আচি।
খরস্রোতা তিস্তার কুকে জেগেছে চর-ডুবোচর। বন্যার পানি সরে যেতেই বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলায় ৭৩৪টি চরে হচ্ছে রবি শস্যের আবাদ। কোথাও কোথাও নদীর অস্তিত্বটুকুও নেই। ভোটের আগে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নিয়ে বালুময় নদীতে ছুটে বেরিয়েছেন কৃষকের কাছে। পানির ন্যয্য হিস্যা আদায়সহ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। অথচ তিস্তাপারের মানুষরা বলছেন, রাজনীতির টানাপোড়নে দীর্ঘদিন আটকে আছে পানি। ন্যায্য হিস্যা বঞ্চিত মরুময় তিস্তা যেন সবার দাবার গুটি। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার বদলেছে, নতুন করে এসেছে প্রতিশ্রুতি। ঘোষণা দিয়েও শুরু করা হয়নি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ। যেন ভোটের রাজনীতি ঝুলছে নদীপারের দুই কোটি মানুষের ভাগ্য। নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে ভারতের কাছ থেকে তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে ব্যর্থ বাংলাদেশ। যার বড়ো প্রভাব পড়েছে উত্তর জনপদে। দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্য ও গরিব জেলাগুলোর পাঁচটিই রয়েছে সর্বনাশা তিস্তাজুড়ে। বন্যা ও খরায় ভারী হচ্ছে এখানকার মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, তিস্তা নদীনির্ভর উত্তরাঞ্চলের কৃষি আজ সংকটে।
স্বাভাবিকভাবে যেখানে ন্যুনতম ১০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে ২০০ কিউসেকও পাওয়া যাচ্ছে না। যৌথ নদী কমিশন-জেআরসি জানায়, ১৯৮৭ সাল থেকেই ভারত একতরফাভাবে তিস্তার পানি প্রত্যাহার করছে। ২০০০ সালের দিকে এ সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে। এরপরই ভারতের সঙ্গে এ চুক্তির বিষয়টি নিয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ। তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতারণামূলক পদক্ষেপের কারণে এ চুক্তিটি এখনো ঝুলে আছে। নদী বিশেষজ্ঞদের দাবি, পানির হিস্যা আদায়ে চুক্তি হলেই বাংলাদেশ পানি পাবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ তিস্তার দু’দেশের সীমান্ত এলাকায় পানি নেই। নদীর উজানে গজলডোবাসহ কয়েকটি এলাকায় অবৈধভাবে অসংখ্য কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। তারপরও পানির হিস্যা পেতে চুক্তি হওয়াটা জরুরি। এটি হলে ভারত চাপে থাকবে।
এমন পরিস্থিতিতে নদী গবেষক ও উন্নয়ন বিশ্লেষকরা বলছেন, নদীকেন্দ্রিক কৃষিজমি রক্ষা, ভাঙন রোধসহ চরগুলো রক্ষায় সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। নয়তো উজানের পলিতে নদীর বুক ভরাট হলে স্বল্প পানিতে প্রতিবছর অনাকাঙ্খিত বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।
তারা মনে করছেন, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি তিস্তা নদীর সুরক্ষার বিষয়টিও এখন জরুরি। নদী গবেষক ও সংগঠক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ যুগের কোনো সময়েই তিস্তা নদীর সঠিক পরিচর্যা হয়নি। বরং দফায় দফায় এ নদীর সর্বনাশ করার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে যে নদী হয়ে ওঠার কথা ছিল উত্তরের জীবনরেখা, সেটা হয়ে উঠেছে অভিশাপ। নদীকে যদি আমরা অভিশাপের হাত থেকে আশীর্বাদে পরিণত করতে চাই, তাহলে এ নদীর সুরক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজন। নদীর ন্যায্য হিস্যা বুঝে নিতে আন্তর্জাতিক আদালতে এর প্রতিকার চেয়ে সরকারকে আবেদন করতে হবে। তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, নদী ভাঙনে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার সরকারি-বেসরকারি সম্পদ, ঘরবাড়ি, ফসলিজমি, রাস্তাঘাট, হাটবাজার মূল্যবান অবকাঠামো তিস্তা খেয়ে ফেলছে। হুমকিতে পড়েছে গোটা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা। বাড়ছে জলবায়ু শরণার্থী-উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা। নদীভাঙনে বাড়ছে রংপুর বিভাগের গড় দারিদ্র্যের হার। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান বলেন, আমরা যত স্থাপনাই তৈরি করি না কেন, আগে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সমন্বিত প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় তিস্তা নদীর উপর নির্ভরশীল মানুষ, জনজীবন ও জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়বে। ভবিষ্যতে আরো মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সকল আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে গত বছর ফুঁসে ওঠে রংপুর অঞ্চলের মানুষ। বিএনপি তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে টানা কয়েক মাস বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। তিস্তা কর্তৃপক্ষ গঠন করে নিজস্ব অর্থায়নে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জোরালো দাবি তুলে ধরেন তিস্তাপারের মানুষ। সরকারের পক্ষ থেকে আশার প্রদীপ জ¦ালালেও সেই আলো এখনো ছড়িয়ে পড়েনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগে তিস্তা নিয়ে বিভিন্ন দল তোলপাড় আন্দোলন করলেও এখন তিস্তা যেন ভোটযুদ্ধে রাজনৈতিক ‘দাবার গুটি’। বিগত পতিত সরকারের মতো ‘তিস্তার সুস্থ্য হয়ে ওঠা’ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে আটকে আছে। তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা নদীবেষ্টিত লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধার মানুষ তিস্তা নদীর পানি বৈষম্যের শিকার হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে আমরা বাকস্বাধীনতা পেয়েছি। রংপুরের মানুষ তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে জেগে উঠেছে।
তিস্তার পানি নিয়ে ভারতীয় আগ্রাসন ও বৈষম্যের বিষয়টি গোটা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা নদীপারের মানুষের অধিকার আদায় করব ইনশাআল্লাহ।
নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে উত্তরবঙ্গে প্রথম তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। গত ২৩ জানুয়ারি রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে নির্বাচনি সমাবেশে তিনি বলেন, নদী জীবন ফিরে পেলে উত্তরবঙ্গ জীবন ফিরে পাবে। তাই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। গত ৩০ জানুয়ারি রংপুর কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, এই (রংপুর অঞ্চল) এলাকাসহ সারা বাংলাদেশে একটি বিরাট সমস্যা হচ্ছে পানি সমস্যা। বিশেষ করে যেহেতু এলাকাটি কৃষি প্রধান। এই এলাকায় পানি সমস্যা সমাধানের জন্য কাজে হাত দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই এলাকার মানুষের স্বপ্ন পূরণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজে যথাসম্ভব দ্রুত আমরা হাত দেব ইনশাআল্লাহ্। এর পর থেকে তিস্তা সমস্যা সমাধানে নতুন করে স্বপ্ন বোনেন তিস্তাপারের মানুষ।