


পার্বতীপুরে নলশিসা নদীর জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে নষ্ট হচ্ছে পাকা ইরি-বোরো ক্ষেত। একদিকে পানিতে ডুবে পড়েছে ধান, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট এবং বাড়তি মজুরির চাহিদায় দিশেহারা এ এলাকার কৃষক। পরিবারের ৫ সদস্য, খাওয়া-দাওয়া, জমজ দুই মেয়ে ছুম্মা আকতার ও ছাবরিন আকতার লেখাপড়া, বৃদ্ধ মা ছবেদা বেওয়া (৭৫) সহ সব খরচই আসে এই ধান থেকে। স্ত্রী অন্যের বাড়ীতে ঝিয়ের কাজ করে চলে সংসার। স্বামী ছবুর আলী (৬০) তিন বারের অপারেশন করেছে। কোন কাজ কর্ম করতে পারে না।
ধার-দেনা করে এবার ২৫ শতক জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদ করেছেন ছালেহা বেগম (৫০)। কষ্টের সেই ধান এবার পাকার আগেই তলিয়ে গেছে নলশিসা নদীর পানিতে। ক্যানকা করি বছরটা পার করিম এ্যালা, এই চিন্তায় মুই রাইতো ঘুমবার পাওছোনা। এই চিন্তায় দিশেহারা উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের পশ্চিম খলিলপুর সরদারপাড়া গ্রামের দিন মজুর কৃষক ছবুর আলীর স্ত্রী ছালেহা বেগমের। নলশিসা নদির জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতি হলেও পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি বিভাগের কাছে কোনো হিসাব নেই। কৃষক তারা বলছে, উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের নলশিসা নদীর দুই পাশে পানিতে এখনও শত শত বিঘা জমির ইরি-বোরা ধান নিমজ্জিত।
সরেজমিনে গতকাল শুক্রবার গিয়ে জানা গেছে, পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের ঝাউপাড়া থেকে নলশিসা নদি ভবানীপুর হয়ে হামিদপুর ইউনিয়নের রিফুজিপাড়া, ঘুঘুমারি, কালিকাপুর, পূর্বশুকদেবপুর, খলিলপুর সরদারপাড়া পাশ দিয়ে পাটিকাঘাট হয়ে নবাবগঞ্জ উপেজলার কোরতোয়া আশুড়া বিলে সংযুক্ত। এক সময় নলশিসা নদি দিয়ে নৌকায় এ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ব্যবসা বাণিজ্য করেছে। ১৯৮০ সালে তৎকালীন হামিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান আফছার আলীর সময় নলশিসা নদীর খাল খনন করা হয়েছিল।
এরপর থেকে আর এই নলশিসা নদী খনন করা হয়নি। গ্রামবাসী নলশিসা নদী খননের জন্য করেছে একাধিক আবেদন। নলশিসা নদির পানি প্রবাহের রাস্তা না থাকায় পানির নিচে জমির ইরি-বোরো ধান নষ্ট হচ্ছে। জলাবদ্ধতায় নলশিসা নদীর পানিতে এই এলাকার হাজার হাজার কৃষক ক্ষতি গ্রস্ত হচ্ছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে নলশিসা নদিত সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় বর্গাচাষী বিধবা ফাতেমা বেগমের দুই বিঘা জমির ইরি-বোরো ধানের মধ্যে ৩০ শতকের ধান বহু কষ্টে ঘরে তুলতে পেরেছেন। অবশিষ্ট দেড় বিঘার ধান নষ্ট হয়ে গেছে। ফাতেমার মতো ফসলের ক্ষতিতে উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নে হাজারো কৃষকের এখন একই অবস্থা। ফসল হারিয়ে অসহায় তাঁরা।
খলিলপুর সরদার পাড়া গ্রামের বর্গাচাষী বিধবা ফাতেমা খাতুন (৫০) জানান, নলশিসা নদিতে তাঁর দুই বিঘা জমির মধ্যে দেড় বিঘা জমির ধান তলিয়ে গেছে। এখন জমিতে পানি থাকায় ধানগাছের গোড়ায় পচন ধরেছে। খলিলপুর সরদার পাড়া গ্রামের ছালেহ কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকায় দুই ফসলের জন্য (বর্গা) চুক্তি নিয়েছেন। দুই বিঘা জমি চাষাবাদ করতে প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে তার। আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেলো। হামিদপুর ইউনিয়নের সস্তাপুর গ্রামের রায়হান আলী হেলাল বলেন, একদিকে ফসল ডুবছে, শ্রমে-ঘামে ফলানো ফসল ঘরে তুলতে পারছে না। নলশিসা নদি এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য। পানি নিষ্কাশনের জন্য নলশিসা নদির খনন করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
তলিয়ে যাওয়া কাঁচা ধান দেখিয়ে আক্ষেপ করে বলছিলেন, শান্তনা বেগম (৩৫) এক বিঘা বোরো কাঁচা ধান ডুবি গেইছে (জলাবদ্ধতা) চোখের সামনে। সামনে একটা বছর কীভাবে যাবে, জানি না, ধার-দেনা করি আবাদ করেছি।
কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শুধু উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়ন নলশিসা নদিতে শত শত বিঘা জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে।
একই এলাকার বৃদ্ধ আব্দুল আলিম (৬৫) বলেন, দুই একর জমি আবাদ করতে গিয়ে ধার-দেনা করতে হয়েছে। ঋণ কীভাবে দেবেন আর বাকি বছর কীভাবে যাবে, এই চিন্তায়। কথা বলার সময় চোখ টলমল করছিল তাঁর।
স্থানীয় ইউপির সদস্য সফিকুল ইসলাম সরদার জানান, নলশিসা নদির জলাবদ্ধতায় জমিতে তলিয়ে গেছে ইরি-বোরা ধান। অন্তত ১৫০-২০০ হেক্টর জমির ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখনও পানি জমে আছে। অনেকে ধান কাটতে পারেনি। নলশিসা নদি জলাবব্ধতায় কারণেই প্রতি বছর ভোগান্তি পোহাতে হয় এলাকার কৃষকদের। নলশিসা নদী খনন জরুরী।
স্থানীয় কৃষি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই এলাকার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় একটু বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতার কারণেই পাকা ইরি-বোরো ধান পানিতে ডুবে থাকছে। তাদের দাবি, জলাবদ্ধতার কারণে নষ্ট হয় শুধু এই ইরি-বোরো মৌসুমেই নয়, আমন-ইরি দুই মৌসুমেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে, কোনো কোনো মৌসুমে অপরিপক্ক কাঁচা ধানই কাটতে হয় চাষিদের। এসব ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে জরুরি ভিত্তিতে ওই এলাকায় নলশিসা নদী খননের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছরই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে হাজার হাজার ধান চাষিকে। এলাকার কৃষকদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে ২০ কিলোমিটার নলশিসা খনন করা হলে উভয় পাশে এই জলাবদ্ধতা থাকবেনা বলে জানান কৃষকরা। খনন করা হলে দ্রুত পানি নেমে গিয়ে একদিকে যেমন নিরসন হবে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে তিন ফসলি চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি হয়ে কৃষক লাভবান হবে বলে মনে করেন সচেতন মহল।
পূর্বশুকদেবপুর গ্রামের গৃহস্থ কৃষক আব্দুল মাবুদ বলেন, প্রতি বছরই বিশেষ করে ইরি-বোরো ও আমন মৌসুমে প্রায় শত শত বিঘা জমির ফসল বিভিন্ন ভাবে নষ্ট হয়। এসময় পানিতে ধান কাটতে কামলা পাওয়া যায় না। দ্বিগুণ মজুরি গুনতে হয়। আর এতে করে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
খলিলপুর সরদার পাড়া গ্রামের বর্গাচাষি নুর মোহাম্মদ বলেন, ধার-দেনা করে দুই বিঘা জমিতে ইরি-বোরো চাষ করেছি। সেই ধান পানিতে ডুবে আছে। এতে যে পরিমাণ খরচ হয়েছে তা-ই উঠবেনা। নলশিসা খনন খুবই দরকার।
একই গ্রামের নাঈম উদ্দিন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনসহ কৃষকদের তিন ফসলের চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি করতে নলশিসা খননের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ঠদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক বলেন, কৃষকদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে নলশিসা খননে পরিষদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বার বার জানিয়েছি। এবার সরাসরি মন্ত্রনায়লে খননের জন্য আবেদন করেছি। তারপরও কাজ হয়নি। ওই এলাকায় নলশিসা খনন অপরিহার্য। তাতে কৃষকেরা ক্ষতি থেকে বাঁচবে এবং তিনটি ফসল চাষাবাদ করে তারা লাভবানও হবে। নলশিসা নদীর সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় এসব ধান নষ্ট হওয়ার শঙ্কা থাকলেও কৃষকরা ওই নদির ধারে চাষাবাদ করে আসছে।
পার্বতীপুর উপজেলা কৃষি অফিসার মো. রাজিব হুসাইন বলেন, উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের কৃষকদের ইরি-বোরো ধান জলাবদ্ধতায় নলশিসা নদীর পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার কোন তথ্য নেই। আগামীকাল রবিবার (১৭ মে) লোক পাঠিয়ে তথ্য নেয়ার পর জানাতে পারবো কি পরিমান ধান ক্ষেত পানিতে ডুবে আছে। এবার ২২ হাজার ৭৯৬ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। তবে, এবার ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
এব্যাপারে পার্বতীপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: সাদ্দাম হোসেন বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে আলোচনা করে ওই এলাকায় নলশিসা নদি খননে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।