
দাখিল পরীক্ষায় ভুয়া পরীক্ষার্থী, জাল সনদ ও নকল বাণিজ্যের সংবাদ প্রকাশের জেরে রংপুরের পীরগাছায় সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুছ সরকারের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ উঠেছে। হামলায় একটি মাদরাসার সুপার ও দুই শিক্ষক নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
বুধবার (২০ মে) রাত পৌণে ৮টার দিকে উপজেলার সোনালী ব্যাংক সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত আব্দুল কুদ্দুছ সরকার দৈনিক সংবাদের পীরগাছা প্রতিনিধি ও পীরগাছা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক আব্দুল কুদ্দুছ সরকার বলেন, রাত ৮টার দিকে সোনালী ব্যাংকের নিচে মুহিব কম্পিউটারে বসে সংবাদ লেখার কাজ করছিলেন তিনি। এ সময় স্বচাষ তালতলা দাখিল মাদরাসার সুপার লুৎফর রহমান তাকে বাইরে ডাকেন। দোকানের বাইরে গেলে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা চালানো হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, হামলায় নেতৃত্ব দেন স্বচাষ তালতলা দাখিল মাদরাসার সুপার লুৎফর রহমান। এ সময় দক্ষিণ ছাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম দুলাল ও রামচন্দ্র মৌজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান অংশ নেন। তারা আগে মোবাইল ফোনে কল করে আমার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালায়।
কুদ্দুছ সরকার বলেন, হামলার সময় অভিযুক্তরা তাকে বিভিন্ন হুমকি দেন। একপর্যায়ে মাদরাসা সুপার লুৎফর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলে-মেয়েরা মাদরাসায় পড়ে। দাখিল পরীক্ষা নিয়ে নিউজ করার শখ মিটাবো।’ রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, ‘দুই মাস জেল খেটেছি। তোকে খুন করে প্রয়োজনে সারাজীবন জেল খাটবো।’ এ সময় তাকে মারধর ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৪ মে দৈনিক সংবাদসহ একাধিক পত্রিকায় ‘লাখো টাকার চুক্তিতে চলছে দাখিল পরীক্ষায় অনিয়ম’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে তাম্বুলপুর দাখিল মাদরাসার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জেনিফা আক্তার জেমি এবারের দাখিল পরীক্ষায় জবানোবিশ মাদরাসার পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন বলে উল্লেখ করা হয়। তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ২৩১৮৮৩০২০৭ এবং রোল নম্বর ১৭৮৯২৮।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নগরজিৎপুর, জবানোবিশ, রহমতচর ও হাসনা মাদরাসার কয়েকজন পরীক্ষার্থীর পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সরকার নির্ধারিত ৪১০ টাকার পরিবর্তে প্রবেশপত্র বাবদ ৫০০ টাকা আদায়, দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকার বিনিময়ে সিসিটিভির আওতার বাইরে পরীক্ষার্থী বসানো এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের কক্ষ পরিদর্শকের দায়িত্ব দিয়ে নকলের সুযোগ তৈরি করার অভিযোগও উঠে আসে।
এ ছাড়া কেন্দ্র সচিব আব্দুস সাত্তার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আতিথেয়তা গ্রহণ করে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন অভিযোগ তদন্তের উদ্যোগ নেন। কেন্দ্রসমূহের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। গত রবিবার অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার ফারুকুজ্জামান ডাকুয়াকে। তাকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আগেও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। দক্ষিণ ছাওলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম দুলালের বিরুদ্ধে এইচএসসি ও ডিগ্রির জাল সনদে চাকরি করার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধান করে অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ওই মামলায় তিনি দুই মাস কারাভোগও করেন।
অন্যদিকে, রামচন্দ্র মৌজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের বার্ষিক পরীক্ষায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে। সেদিন সকালের পরীক্ষা শেষে বিদ্যালয় বন্ধ করে শিক্ষকরা চলে যাওয়ায় বিকেলের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। পরীক্ষা দিতে এসে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে তালা ঝুলতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। পরে এ ঘটনায় তাকে শোকজ করা হয়।
পীরগাছা প্রেস ক্লাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের জেরে সংঘবদ্ধভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। আমরা দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Related